অনলাইন ডেস্ক, ১৫ আগস্ট, ২০২৪: ত্রিপুরা বিকাশের এক নতুন যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। বিগত বছরগুলিতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ত্রিপুরা গড়ে তোলার জন্য সরকার কাজ করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক কল্যাণ ও মানব সম্পদ উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতেও সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। আজ সকালে আসাম রাইফেলস ময়দানে ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন।
রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য সরকারের অভিমুখের কথা উল্লেখ করে বলেন, উন্নয়ন কাজে জনগণের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, স্থায়িত্ব ও সুশাসনের নীতির দ্বারা সরকার পরিচালিত হচ্ছে। রাজ্যের প্রত্যেক নাগরিকের কাছে উন্নতমানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ- সুবিধা সুনিশ্চিত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। পরিবেশ সংরক্ষণ, সংস্কৃতি, এবং আমাদের যুবকদের ক্ষমতায়নের জন্য রাজ্য সরকার দায়বদ্ধ। আসাম রাইফেলস ময়দানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা সম্মিলিত বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। কুচকাওয়াজে সিকিউরিটি ও ননসিকিউরিটি বিভাগে ১৬টি প্ল্যাটুন অংশগ্রহণ করে৷
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে রাজ্য পুলিশ বাহিনীর যেসমস্ত আধিকারিক ও কর্মীগণ কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পদক পেয়েছেন তাদের পদক পরিয়ে দেন৷ অনুষ্ঠান শেষে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তর, ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের পরিচালনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ভারতীয়ম পরিবেশিত হয়৷ এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেয়। আসাম রাইফেসল ময়দানে মূল অনুষ্ঠানে মুখ্যসচিব জে কে সিনহা, রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক অমিতাভ রঞ্জন এবং রাজ্য প্রশাসন ও আরক্ষা প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ত্রিপুরাকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজ্য সরকার রূপান্তরমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে৷ ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও সাফল্যের পরেও সরকার সুনির্দিষ্ট সমতাভিত্তিক ও স্পন্দনশীল সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা রাজ্যের প্রত্যেক নাগরিক সমৃদ্ধ হতে পারেন। এজন্য বেশ কিছু রূপান্তরমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দুই অঙ্কের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে পরিকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাণিজ্যিক সংস্কার ও কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াগুলিকে ঢেলে সাজিয়ে সহজে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং নাগরিকদের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনে ই-অফিস কার্যকরের উদ্যোগটি রেকর্ড সময়ে মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে গ্রাম পঞ্চায়েতস্তর পর্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। রাজ্যের ৯২ শতাংশ গ্রামে 4G সংযোগের সুবিধা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পে’র আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আই ও টি (Internet of things), সাইবার নিরাপত্তা, 5G প্রযুক্তি এবং ড্রোন প্রযুক্তির মতো উন্নত কোর্সের মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এর ফলে আমাদের যুব সমাজ ভবিষ্যতে উপযোগী দক্ষতায় সমৃদ্ধ হবে ও আন্তর্জাতিকস্তরে প্রতিযোগিতামুখী হয়ে উঠবে।
মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, রাজ্যে সুশাসন দপ্তর এবং স্টেট ইনস্টিটিউট ফর ট্রান্সফরমেশান স্থাপন করা হয়েছে। এই উদ্যোগ জ্ঞান অর্জন এবং প্রশাসন পরিচালানার একটি প্ল্যাটফর্ম। মুখ্যমন্ত্রী ভিশন ইন্ডিকেটরস-২০৪৭ এবং রাজ্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের কৌশলসমূহ তুলে ধরে বলেন, রাজ্যে শিল্প ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে কৃষির উপর শ্রমশক্তির নির্ভরশীলতা ৫০ শতাংশ হ্রাস করা, পার্শ্ববর্তী দেশ ও ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য ১ লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা, ২০৪৭ সালের মধ্যে পর্যটন ক্ষেত্রে গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট অন্তত ১৫ শতাংশ অবদান নিশ্চিত করার উপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তাছাড়া পরিকাঠামো, যোগাযোগ এবং লজিস্টিক সেক্টরে সেচের আওতায় ৮০ শতাংশ চাষযোগ্য জমি নিয়ে আসা, ১৫০ কিলোমিটার নদীর নাব্যতা সৃষ্টি করা, সমস্ত রেলওয়ে স্টেশন, বিমানবন্দর, হেলিপ্যাড, নদী বন্দর, পর্যটন স্থান, ইকো পার্ক, আন্তর্জাতিক সীমান্তের সাথে চার লেন সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা এবং রাজ্যে অতিরিক্ত বিমানবন্দর চালু করা ও লজিস্টিক পরিষেবার বিকাশের উপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাথমিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারের অভিমুখের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বনজ উৎপাদিত সামগ্রীর মূল্য পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করা, খুব ঘন বনের পরিমাণ অন্তত ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা, যাতে গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, বনাঞ্চলে জলাশয় আড়াই গুণ বৃদ্ধি ও আগর কাঠের অর্থনীতি ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাছাড়া প্রাথমিক ক্ষেত্রে ৭৫শতাংশ কৃষিজ ফসলকে রিক্স ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনা, সমস্ত প্রধান ফসলের জন্য উৎপাদনশীলতা তিনগুণ করা, কৃষকদের আয় ৫ গুণ বাড়ানো, কৃষি সহায়তা চার গুণ বৃদ্ধি, মাছের উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যের মাছের উৎপাদন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার উপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সামাজিক ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সমস্ত বিদ্যালয়ে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি ও বৃত্তিমূলক ল্যাব প্রদান করা, সমস্ত স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং গবেষণারত শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ চালু করা, একটি মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, ত্রিপুরায় স্পেশালিটি ও সুপার স্পেশালিটি স্বাস্থ্য পরিষেবায় স্বনির্ভরতা অর্জন এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজ্যকে অগ্রণী রাজ্য হিসাবে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ রাজ্যের পথ প্রশস্ত করতে সুশাসন সেক্টরে ত্রিপুরাকে ডিজিটাল সোসাইটি হিসেবে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের রাবার, বাঁশ, গ্যাস, পর্যটন এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের মতো ক্ষেত্রগুলিতে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার জন্য ‘ত্রিপুরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন ইনসেনটিভ স্কীম- ২০২৪’ চালু করা হয়েছে। শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজতর এবং অনুকুল বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরী করতে স্বাগত পোর্টাল চালু করা হয়েছে যা, ইজ অব ডুইং বিজনেস নীতিকে বাস্তবায়িত করবে।
তিনি বলেন, তরুন উদ্যোগপতিদের জন্য যুব ত্রিপুরা, নতুন ত্রিপুরা, আত্মনির্ভর ত্রিপুরা নামে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং রাজ্যে শিল্পের প্রসার ও উন্নয়নে যুব সমাজকে ক্ষমতায়ন করা৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের প্রথম চা নিলাম কেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এতে রাজ্যের উৎপাদিত উচ্চ গুণমানের চায়ের বাজারজাতকরণ ও চা শিল্পে নতুন একটি যুগের সূচনা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলনে, সরকার পর্যটন ক্ষেত্রের পরিকাঠামোর উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। স্বদেশ দর্শন ও প্রসাদ প্রকল্প, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের আর্থিক সহায়তা ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। মুখ্যমন্ত্রীক বলেন, রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে সরকার ১৯টি শিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণ ও টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেসের সাথে একটি মউ স্বাক্ষর করেছে। যাতে শিক্ষার্থীরা চাকুরির বাজারের সাথে প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ পেতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনায় রাজ্যে ৫০ হাজার আবেদনকারী নিবন্ধন করেছেন। এখন পর্যন্ত ২০টি দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সরকার মহিলাদের ক্ষমতায়ণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। মহিলা স্টার্ট-আপগুলিকে বন্ধকহীন ঋণ প্রদান, শিল্প উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। মহিলাদের সহায়তায় একটি টোল-ফ্রি হেল্পলাইন এবং জেলা মহিলা হাব গঠন করা হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে মহিলাদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে সরকারি মার্কেট স্টল বন্টনে ৫০ শতাংশ মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মহিলাদের সমষ্টিগত ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ৪ লক্ষ ৭১ হাজার গ্রামীণ মহিলাকে স্ব-সহায়ক গোষ্ঠীতে যুক্ত করা হয়েছে। গ্রামীণ মহিলা উদ্যোক্তা ‘লাখপতি দিদি’-দের উন্নয়নে সহায়তা করা হচ্ছে। বর্তমানে ৮৩ হাজার ৪২৪ জন ‘লাখপতি দিদি’ রয়েছেন। সম্পত্তির মালিকানাতে উৎসাহিত করতে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনে মহিলাদের জন্য স্ট্যাম্প ডিউটিতে ১% হ্রাস করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে পরিশ্রুত পানীয়জল সুনিশ্চিত করতে জল জীবন মিশনে রাজ্যের ৭ লক্ষ ৪৯ হাজার পরিবারের মধ্যে ৬ লক্ষ ১৩ হাজার অর্থাৎ ৮২% গ্রামীণ পরিবারকে নলবাহিত পানীয় জলের সংযোগ পৌছে দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে চ্যালেঞ্জিং ভূখন্ডগুলিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ প্রকল্প এবং ছড়ার জল শোধন কেন্দ্র সহ ৪৭১টি উদ্ভাবনী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিকাঠামোর কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মী বাড়াতে রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস আসনের সংখ্যা ২০০ থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৪০০ করা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্য রেফারেল হাসপাতাল জিবিপি হাসপাতালে রোগীদের শয্যা সংখ্যা ৭২৭ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৪১৩ করা হয়েছে। ডেন্টাল স্বাস্থ্য পরিসেবা সম্প্রসারণের জন্য বার্ষিক ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আগরতলা সরকারি ডেন্টাল কলেজ নামে একটি নতুন ডেন্টাল কলেজ স্থাপিত হয়েছে।
তাছাড়াও শিশুদের জন্মগত হৃদ রোগের চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের অ্যাপেলো শিশু হাসপাতালের সাথে একটি মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। রাজ্যে প্রথমবার কিডনি প্রতিস্থাপনের সুবিধা চালু করা হয়েছে। এই উদ্যোগ চিকিৎসা পরিষেবার পরিসরকে আরও প্রসারিত করবে। স্বাস্থ্য বীমা প্রসঙ্গের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় প্রায় ১৫ লক্ষ সুবিধাভোগী আয়ুষ্মান ভারত কার্ড পেয়েছেন। ৪ লক্ষেরও বেশি ব্যক্তিকে মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় কার্ড দেওয়া হয়েছে।
সহজে স্বাস্থ্য পরিসেবা প্রদানের জন্য রাজ্যে ১ হাজার ১২৮টি আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির চালু রয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করতে বিদ্যালয়গুলিতে টিংকারিং ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষায় প্রযুক্তিকে সংহত করতে আইসিটি ইন স্কুল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, কৃষি এবং আরও অনেক সেক্টরে স্কুলগুলিতে বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করা হয়েছে। শিক্ষায় প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্জনে রাজ্যের ৮৫৪টি বিদ্যালয়ে স্মার্ট ক্লাস চালু করা হয়েছে।
দিব্যাঙ্গ শিশুদের শিক্ষায় সহায়তার জন্য ‘সক্ষম ত্রিপুরা’ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সর্বশেষ শিক্ষাগত নির্দেশিকার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যে সমস্ত বিদ্যালয়ে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি সফলভাবে গৃহীত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শিক্ষা প্রদানের জন্য শিক্ষার বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে ৫টি ‘পি এম ই-বিদ্যা টিভি চ্যানেল’ চালু করা হয়েছে এবং এগুলিকে স্মার্ট ক্লাসের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। গুণগত শিক্ষা প্রদান এবং উৎকর্ষতা প্রসারের লক্ষ্যে রাজ্যে ৮২-টি পিএম-শ্রী স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার বিদ্যুৎ পরিষেবার পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের আর্থিক সহায়তায় ২,২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ত্রিপুরা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশান স্ট্রেংদেনিং এন্ড জেনারেশন ইফিসিয়েন্সি প্রকল্প রূপায়ন করছে। রাজ্য, ৮০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে রিভ্যাম্পড রিফর্মড বেইসড রেজাল্ট লিংঙ্কড ডিস্ট্রিবিউশান সেক্টর প্রকল্প রূপায়ন করছে। পিএম-জনমন প্রকল্পে ভারত সরকার ত্রিপুরার রিয়াং সম্প্রদায়ের পরিবারের বিদ্যুতায়নের জন্য ৬০ কোটি ৬ লক্ষ টাকা অনুমোদন করেছে এবং ৩,৬১৮টি পরিবারকে ইতোমধ্যে অন-গ্রিড মুডে বিদ্যুতায়ন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার শ্রমিকদের কল্যাণে নির্মাণ শ্রমিক প্রকল্প-২ চালু করেছে।
রাজ্যে কৃষির বিকাশ ও কৃষকের কল্যাণে এবং বনভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মাননিধি যোজনায় রাজ্যে ২০২৩-২৪ সালে ২ লক্ষ ৩৬ হাজার কৃষকের অ্যাকাউন্টে ১৩১ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকা সরাসরি প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনায় রাজ্য সরকার ‘মুখ্যমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা’ নামে একটি পরিপূরক উদ্যোগ চালু করে প্রিমিয়ামের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষকের অংশ সরকার বহন করেছে।
এরফলে ২০২৩-২৪ সালে রাজ্যের ৩ লক্ষ ৮১ হাজার কৃষক ফসল বীমার আওতায় এসেছেন। কৃষিক্ষেত্রে কৃষি শ্রমিক সংকট নিরসনে ২০23-24 অর্থবছরে ৮ হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরণের আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তর ভূমি রেকর্ড এবং রিয়েল-টাইম ফসল জরিপের জন্য ইউনিফাইড ফার্মার ডাটাবেস তৈরির কাজটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত এই পোর্টালে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার ৫০০ জন কৃষকের বিবরণ নিবন্ধিত হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ১ লক্ষ ২১ হাজার ৫১২ হেক্টর চাষযোগ্য জমিকে নিশ্চিত সেচের আওতায় আনা হয়েছে। 2024-2৫ থেকে ২০২৭-২৮ সাল পর্যন্ত চার বছরের মধ্যে সরকার নিশ্চিত সেচের আওতায় ৩০ হাজার ৮৪ হেক্টর জমিতে ৪৭টি ক্ষুদ্র সেচ সংরক্ষণ প্রকল্পে বৃষ্টির জল সংগ্রহের কাঠামো, ৫টি ডাইভারশন স্কিম, ৫০০টি গভীর নলকূপ প্রকল্প, ৩৫টি উত্তোলন সেচ প্রকল্প ও ৫ হাজার ৩৫১টি অগভীর টিউবওয়েল স্কিম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বনভিত্তিক পরিকল্পনায় সরকার জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে পরিবেশগত সুরক্ষা বাড়ানোর প্রচেষ্টায় নিরলসভাবে কাজ করছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৩ হাজার ৬২০ হেক্টর বনভূমি, ২ হাজার ৫০৫ কিলোমিটার রাস্তার ধারে ও নদীতীরে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। ৩১ মার্চ, 2024 পর্যন্ত ১২ হাজার ৬৩২ হেক্টর বনাঞ্চলে বনায়ন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৩-২৪ সালে মাটির সামগ্রিক আর্দ্রতা এবং বৃষ্টির জল সংগ্রহের জন্য বনাঞ্চলে অমৃতসরোবর সহ ৩৫১টি চেকড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে।
এই চেকড্যামগুলি যৌথ বন পরিচালনা কমিটি ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে মৎস্য চাষও সেচের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর স্বনির্ভর পরিবার যোজনার অধিনে বন দপ্তর প্রায় ২ লক্ষ পরিবারের মধ্যে ১০ লক্ষ চারা বিতরণের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারের নাগরিকদের মধ্যে পুষ্টি, পরিবেশগত এবং আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 2023-24 অর্থবছরে এখনও পর্যন্ত ৭৪৯টি গ্রামে ১ লক্ষ ৫৮ হাজার পরিবারকে মোট ৭ লক্ষ ৯২ হাজার চারা বিতরণ করা হয়েছে।
সকল অংশের জনগণের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে রাজ্য সরকার সফলভাবে বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের জন্য ৫ জুলাই, ২০২৪ একটি গণ বৃক্ষরোপণ অভিযান আয়োজন করা হয়েছিল। এই কর্মসূচিতে রাজ্যজুড়ে ৫ মিনিটে মোট ৬ লক্ষ ২১ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ব্লু রিয়াং শরণার্থী পরিবারগুলিকে গনবন্টন ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। তাদের খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার ৬ হাজার ২৫০টি পরিবারের মোট ২২ হাজার সদস্যকে রেশন কার্ড প্রদান করেছে। অবশিষ্ট ব্লু পরিবারগুলি স্থায়ী পুনর্বাসনে স্থানান্তরিত হলেই গনবন্টন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্য সরকার, ভারত সরকারের পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রকের রাষ্ট্রীয় গ্রাম স্বরাজ অভিযান প্রকল্পে, রাজ্যের মধ্যে এক্সপোজার ভিজিট পরিচালনার জন্য গ্রাম অন্বেষণ নামে একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকার ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ব্যাক ইয়ার্ড প্রাথমিক কর্মসূচি এবং বনায়ণের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে মুখ্যমন্ত্রী স্বনির্ভর পরিবার যোজনায় ২ লক্ষ ৯৫ হাজার গ্রামীণ পরিবারকে সফলভাবে উপকরণ সরবরাহ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জনজাতিদের আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষ করে শিক্ষার পরিকাঠামো নির্মান,দক্ষতা উন্নয়ন, প্রসার ও জনজাতিদের সংস্কৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পরিকাঠামো উন্নয়নকে সরকার অগ্রাধিকারের সাথে গুরুত্ব দিয়েছে। রাজ্য সরকার ২০২২-২৩ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় ১২৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করেছে ও ১০টি জনবসতিকে সংযুক্ত করা হয়েছে। এপ্রিল, 2023 থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে ও ৫টি জনবসতি সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে পিএমজিএসওয়াই-১ এর আওতায় ১০টি সেতু এবং ৪২টি সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে৷ পিএমজিএসওয়াই-২ এর আওতায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১০টি সড়কের আপগ্রেডেশনের কাজ চলছে৷ পিএমজিএসওয়াই-৩ এর অধীনে ২৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৩২টি রাস্তার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সরকার সমগ্র রাজ্যের সার্বিক পরিবহণ পরিকাঠামো তথা লজিস্টিক উন্নয়নের লক্ষ্যে উদয়পুরে মাল্টি মোডাল লজিস্টিক পার্ক নির্মাণের জন্য জমি চিহ্নিত করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে ৯২৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৬টি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে প্রায় ৪৯০ কিলোমিটার ইতিমধ্যে ডাবল লেন স্ট্যান্ডার্ডে উন্নীত করা হয়েছে। ২২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আরও ৪টি জাতীয় মহাসড়ক ঘোষিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জনকল্যাণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সংস্কৃতির প্রসারেও সরকারের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচির জন্য তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর সাংস্কৃতিক বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেছে।
তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর প্রতি ঘরে সুশাসন কর্মসূচি-২ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। তাছাড়া রাজ্যে হর ঘর তিরঙ্গা কর্মসূচিও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যবাসীর কাছে এটা গর্বের বিষয় যে গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভূমি সম্পদ বিভাগের ডিজিটাল ইন্ডিয়া ল্যান্ড রেকর্ডস মডার্নাইজেশন প্রোগ্রামের মূল উপাদানগুলির উপর স্যাচুরেশন অর্জনের জন্য ত্রিপুরা রাজ্য এবং রাজ্যের সাতটি জেলাকে ভূমি সম্মান পুরস্কার প্রদান করেছেন। তাছাড়া রাজ্য ‘ভূ-নক্সা’সফটওয়্যার তৈরি করেছে, যা জমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা পুলিশ ১৫০ বছর উদ্যাপন করেছে এবং ভারতের কয়েকটি রাজ্য পুলিশ সংস্থার মধ্যে ত্রিপুরা পুলিশ একটি, যাদের আইনের শাসন বজায় রাখার দীর্ঘ ইতিহাস এবং ঐতিহ্য রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন সবার অংশগ্রহণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিকশিত ভারত এবং এক ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। আসাম রাইফেলস ময়দানে ৭৮তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজে ১৬টি প্ল্যাটুন অংশ নেয়।
সিকিউরিটি বিভাগে বিএসএফ, আসাম রাইফেলস, সিআরপিএফ, আসাম পুলিশ, টিএসআর ১৪নং ব্যাটেলিয়ান, মহিলা টিএসআর বাহিনী, পশ্চিম জেলা পুরুষ, ট্রাফিক পুলিশ, ফরেস্ট গার্ড ও হোম গার্ড এবং নন সিকিউরিটি বিভাগে এনসিসি বয়েজ, এনসিসি গার্লস, গার্লস গাইড, এনএসএস, সিভিল ডিফেন্স ও আসাম রাইফেলস পাবলিক স্কুল অংশ নেয়। প্যারেড কমান্ডার ছিলেন ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুধামবিকা আর। তাছাড়াও ৪টি ব্যান্ড প্ল্যাটুন কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। কুচকাওয়াজে উৎকর্ষতা প্রদর্শনের জন্য সিকিউরিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে আসাম রাইফেলস, টিএসআর ১৪নং ব্যাটেলিয়ান, বিএসএফ। নন সিকিউরিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে আসাম রাইফেলস পাবলিক স্কুল, এনসিসি গার্লস ও এনএসএস।









