‘রামায়ণ: পার্ট ১’—দৃশ্যবৈভব ও অভিনয়ে নজরকাড়া

অনলাইন ডেস্ক,  ০৬ নভেম্বর, ২০২৬ : রণবীর কাপুর, যশ ও সাই পল্লবী অভিনীত বহু প্রতীক্ষিত পৌরাণিক ছবি ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ গত ৫ নভেম্বর, ২০২৬ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি পরিচালনা করেছেন নীতেশ তিওয়ারি। প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছেন নমিত মালহোত্রা ও যশ। প্রাইম ফোকাস স্টুডিওস, ডিএনইজি এবং মনস্টার মাইন্ড ক্রিয়েশনসের ব্যানারে নির্মিত এই ছবিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উচ্চাভিলাষী ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা। অভিনয়, দৃশ্যায়ন, সংগীত এবং অ্যাকশন—সব মিলিয়ে ছবিটি দর্শকদের সামনে এক বর্ণাঢ্য পৌরাণিক জগৎ উপস্থাপন করেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যের গতি ও আবেগের ঘাটতি ছবির সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করেছে।

‘রামায়ণ: পার্ট ১’-এ মূলত অযোধ্যার রাজপুত্র রাম এবং লঙ্কার শক্তিশালী সম্রাট রাবণের সমান্তরাল জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে ভগবান শিবের প্রতি গভীর ভক্তি ও সাধনার মাধ্যমে রাবণের ক্ষমতার উত্থান এবং কুবেরকে পরাজিত করে লঙ্কার অধিপতি হয়ে ওঠার কাহিনি। অন্যদিকে ঋষি বিশ্বামিত্রের নির্দেশনায় ন্যায়পরায়ণ যোদ্ধা হিসেবে গড়ে ওঠেন রাজপুত্র রাম।

তাড়কা রাক্ষসীকে বধ করার পর ভগবান শিবের পবিত্র ধনুক তুলে সীতা স্বয়ংবর জয় করেন রাম। এরপর শুরু হয় রাম ও সীতার দাম্পত্য জীবনের নতুন অধ্যায়।

কিন্তু রামের রাজ্যাভিষেকের প্রস্তুতির মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। মন্থরার প্ররোচনায় রানি কৈকেয়ী রাজা দশরথের কাছে নিজের পুত্র ভরতের রাজ্যাভিষেক এবং রামের ১৪ বছরের বনবাসের দাবি জানান। পিতার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় রাম বনবাসে যেতে সম্মত হন। তাঁর সঙ্গে বনযাত্রায় সঙ্গী হন স্ত্রী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণ।

বনবাসের সময় রাবণের বোন শূর্পণখা সীতার ক্ষতি করার চেষ্টা করলে লক্ষ্মণ তাঁর নাক কেটে দেন। এর প্রতিশোধ নিতে শূর্পণখা রাবণকে সীতাকে অপহরণের জন্য প্ররোচিত করে। এরপর রাবণ মারীচের সাহায্যে সোনার হরিণের ছদ্মবেশে এক কৌশল রচনা করে। সেই হরিণের পিছনে রামকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে লক্ষ্মণও রামের সাহায্যে চলে গেলে ঋষির ছদ্মবেশে রাবণ সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যায়।

পথে মহাবীর জটায়ু সীতাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও রাবণের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। মৃত্যুর আগে তিনি রামকে সীতার অপহরণ এবং রাবণের লঙ্কার দিকে পালিয়ে যাওয়ার কথা জানান। শোকে মুহ্যমান রাম জটায়ুর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সীতাকে উদ্ধারের এবং রাবণকে পরাজিত করার শপথ নেন। এভাবেই শুরু হয় লঙ্কার উদ্দেশে তাঁর যাত্রা।

‘রামায়ণ: পার্ট ১’ নিঃসন্দেহে ভারতীয় মহাকাব্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি উচ্চাভিলাষী প্রয়াস। দুর্দান্ত অভিনয়, বিশাল সেট, উন্নত ভিজ্যুয়াল এফেক্টস এবং অ্যাকশন দৃশ্য ছবিটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। কিছু দৃশ্যে প্রযুক্তিগত ত্রুটি চোখে পড়লেও সামগ্রিক দৃশ্যায়ন সাম্প্রতিক ভারতীয় সিনেমার অন্যতম বৃহৎ উপস্থাপনা।

ছবির অন্যতম বড় শক্তি এর অভিনেতা নির্বাচন। বিশেষ করে রাবণের চরিত্রে যশ দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রচলিত ভাল ও মন্দের সরল সংঘাতের বাইরে গিয়ে রাবণকে একটি জটিল ও ধূসর চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটির ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিত্ব, অহংকার এবং মানসিক পরিবর্তন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

রাবণের দশমস্তক রূপের উপস্থাপনা, তাণ্ডব নৃত্যের দৃশ্য এবং একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাসক থেকে অহংকারে আচ্ছন্ন সম্রাটে পরিণত হওয়ার অভিনয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রাজপুত্র রামের চরিত্রে রণবীর কাপুর সংযত, মার্জিত ও মর্যাদাপূর্ণ অভিনয় করেছেন। সীতার ভূমিকায় সাই পল্লবীও সাবলীল ও আবেগঘন অভিনয়ের পরিচয় দিয়েছেন। এ আর রহমান এবং হান্স জিমারের যৌথ সংগীত ছবির পৌরাণিক আবহ ও নাটকীয় মুহূর্তগুলিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

অযোধ্যা ও লঙ্কার দৃশ্যায়ন ছবির অন্যতম আকর্ষণ। উন্নত কম্পিউটার গ্রাফিক্স এবং ভিজ্যুয়াল এফেক্টসের মাধ্যমে পৌরাণিক জগৎকে বাস্তবসম্মত করে তোলার চেষ্টা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে রাবণ ও জটায়ুর সংঘর্ষের দৃশ্যটি অ্যাকশন এবং আবেগের এক অসাধারণ মেলবন্ধন তৈরি করেছে।

বিপুল আয়োজন ও দৃশ্যবৈভব থাকা সত্ত্বেও ছবির কিছু অংশে কাহিনির গতি সমস্যার সৃষ্টি করেছে। রামের শৈশব ও প্রাথমিক জীবন, সীতার স্বয়ংবর এবং বনবাসে যাওয়ার আগের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি বেশ দ্রুত তুলে ধরা হয়েছে। ফলে এই ঘটনাগুলির আবেগ ও নাটকীয়তা যথাযথভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।

চিত্রনাট্যের এই অসম গতি ছবির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে রামের বনবাস এবং অরণ্যের পরবর্তী ঘটনাগুলিতে যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা, তা সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

এছাড়া কয়েকটি সংলাপে রামায়ণের মতো মহাকাব্যের সঙ্গে মানানসই কাব্যিক গভীরতা ও গাম্ভীর্যের অভাব রয়েছে। রাম ও সীতার চরিত্রে রণবীর ও সাই পল্লবী আলাদাভাবে প্রশংসনীয় অভিনয় করলেও পর্দায় তাঁদের মধ্যে প্রত্যাশিত রসায়ন কিছুটা অনুপস্থিত।

অন্যদিকে, উন্নত ভিজ্যুয়াল এফেক্টসের পাশাপাশি কয়েকটি দৃশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর দৃশ্যায়ন কিছুটা অপরিণত ও অপেশাদার মনে হয়েছে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ সিজিআই ব্যবহারের মধ্যে এই ত্রুটিগুলি আরও বেশি চোখে পড়ে।

এই ছবিতে রাবণের চরিত্রে যশ অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। শিবভক্ত পণ্ডিত থেকে অহংকারী ও পরাক্রমশালী শাসকে রাবণের রূপান্তর তিনি দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। চরিত্রটির মধ্যে থাকা শক্তি, ঔদ্ধত্য এবং ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব তাঁর অভিনয়ে যথাযথভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

সীতার চরিত্রে সাই পল্লবীও যথেষ্ট প্রশংসনীয়। তাঁর অভিনয়ে সীতার সৌন্দর্য, ধৈর্য, আত্মমর্যাদা ও মানসিক দৃঢ়তা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে রাবণের সীতা অপহরণের দৃশ্যটি ছবির অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত।

রণবীর কাপুর রামের চরিত্রে শান্ত, সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ অভিনয় করেছেন। তাঁর চরিত্রে ন্যায়পরায়ণতা এবং ঐশ্বরিক প্রশান্তির প্রকাশ রয়েছে। তবে যাঁরা রামের চরিত্রে আরও শক্তিশালী ও বীরোচিত উপস্থিতি আশা করেছিলেন, তাঁদের কাছে এই সংযত অভিনয় কিছুটা কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। দ্বিতীয় পর্বে তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি প্রত্যাশা থাকবে।

লক্ষ্মণের চরিত্রে রবি দুবে যথেষ্ট ভালো অভিনয় করেছেন। ভাইয়ের প্রতি আনুগত্য, সুরক্ষার মনোভাব এবং আবেগপ্রবণতা তাঁর অভিনয়ে ফুটে উঠেছে। রাজা দশরথের ভূমিকায় অরুণ গোভিল চরিত্রটিতে আবেগের গভীরতা এনেছেন। অন্যদিকে, কৈকেয়ীর চরিত্রে লারা দত্তের অভিনয়ও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে রামের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের দৃশ্যগুলি প্রশংসার দাবি রাখে।

কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ একটি উচ্চাভিলাষী ও দৃষ্টিনন্দন পৌরাণিক চলচ্চিত্র। অভিনয়ের দক্ষতা, বিশাল দৃশ্যায়ন, উন্নত প্রযুক্তি এবং সংগীতের সমন্বয়ে ছবিটি দর্শকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় সিনেমার অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। ছবির শেষ অংশে পরবর্তী কাহিনির যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে তুলবে। বিশেষ করে শেষের চমক দর্শকদের মধ্যে নতুন কৌতূহল তৈরি করে।

সব মিলিয়ে, মহাকাব্যিক দৃশ্যবৈভব এবং পৌরাণিক কাহিনির আধুনিক উপস্থাপনা দেখতে চাইলে প্রেক্ষাগৃহে ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ উপভোগ করা যেতে পারে। কিছু চিত্রনাট্যগত দুর্বলতা থাকলেও বড় পর্দায় ছবিটির দৃশ্যায়নই অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।