কলকাতা, ৭ নভেম্বর : হিন্দুদের যেমন মহালয়া ও ভূত চতুর্দশী; খ্রিষ্টানদের তেমনই হ্যালোইন এবং অল সোলস’ ডে। হিন্দু মতে, আমাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয় মহালয়াতে। ভূত চতুর্দশী পর্যন্ত নিবিড় থাকে বর্তমান ও অতীতের যোগাযোগ। আবার সাহেবদের হ্যালোইন হলো মৃতদের পুনরুত্থানের দিন। খ্রিষ্ট ধর্ম বলে, মৃত আত্মারা জীবিতদের জন্য প্রার্থনা করতে পারেন, তাঁদের আশীর্বাদও করতে পারেন। কিন্তু নিজেদের জন্য প্রার্থনা করতে পারেন না। তাই যাঁরা এখন অতীত, অল সোলস’ ডে-তে আলাদাভাবে তাঁদের জন্যই প্রার্থনা করার দিন।
লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ, ভারত হোক বা দক্ষিণ এশিয়া, সব অঞ্চলের ধর্মীয় বিশ্বাসেই রয়েছে বছরের বিভিন্ন সময়ে অতীতের বারবার ফিরে ফিরে আসা। সব সংস্কৃতিতেই বিশ্বাস, মৃত ব্যক্তিদের আত্মা ঘুরেফিরে বেরান আমাদের মাঝেই।
প্রাচ্যের মার্কন্ডেয় পুরাণ বলে পিত্রু অর্থাৎ পূর্বপুরুষ তাঁর শ্রাদ্ধাচারে সন্তুষ্ট হয়ে উত্তরসূরির দীর্ঘায়ু, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সমৃদ্ধি কামনা করেন। আবার পাশ্চাত্যের ফরাসি ঔপন্যাসিক মারগুয়েরিট ইওরসেনার বলেছিলেন, পূর্বপুরুষদের স্মরণের এই অনুষ্ঠান পৃথিবীর আদিতম উদযাপন। শস্য তোলা হয়ে গেলে ফাঁকা ফসলবিহীন মাঠে আত্মারা শুয়ে থাকেন, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সময়ে হয় স্মৃতির উদযাপন।
প্রায় দু’ হাজার বছর আগে রোমানদের মধ্যেও একটা উৎসবের প্রচলন ছিল- ‘লেমুরিয়া’। মৃতজনেদের কবরে গিয়ে কেক এবং ওয়াইন ভাগ করে নিতেন রোমানরা। পেগান ধর্মের এই রীতিই পরে আপন করে নেন খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা।
সুদূর মেক্সিকোতে ২ নভেম্বর পালিত হয় এল দিয়া দ্যা লস মুয়েরতস। খ্রিষ্ট ধর্মের জন্মের অনেক আগে থেকে উদযাপিত হত এই অনুষ্ঠান। এও মৃত পূর্বপুরুষের উদ্দেশে। নানা রঙের পোশাকে আসলে আত্মার নানা রূপ তুলে ধরা হয় এই উৎসবে। এদের বিশ্বাস, আত্মারা এই সময় প্রিয়জনদের ঘরেই থেকে যান। তাই ঘরের বাইরে ফেলে ছড়িয়ে রাখা হয়, খাবার, পানীয়, নানা উপহার।
ব্রাজিলে দিনটি উদযাপিত হয় ফিনাদোস হিসেবে। কম্বোডিয়ায় চুম বেন পালিত হয় মাস খানেক আগে। চিন, সিঙ্গাপুরে ‘মান্থ অব হাঙ্গরি ঘোস্টস’ হিসেবে পালিত হয়।
অস্ট্রিয়ায় ৩০ অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর টানা এক সপ্তাহ ‘অল সোলস উইক’ পালন করা হয়। এই এক সপ্তাহ পূর্বপুরুষদের মৃত আত্মার উদ্দেশে ঘরের টেবিলের ওপর খাবার, জল রেখে ও ল্যাম্প জ্বেলে ঘুমোতে যান অস্ট্রিয়রা। এর পর ১ নভেম্বর সন্ধে বেলায় পালিত হয় অল সেন্টস ডে। এ দিন পরিবারের প্রিয়জনদের সমাধিক্ষেত্রে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
জার্মানরা বিশ্বাস করেন হ্যালোউইনের রাতে মৃত অতৃপ্ত আত্মারা নেমে আসে পৃথিবীতে। তাই এই রাতে ছুরি, কাঁচি সব লুকিয়ে ফেলেন তাঁরা। বার্লিনের হ্যালোইন কস্টিউম পার্টির খ্যাতি পৃথিবী জোড়া।
চেক রিপাবলিকের হ্যালোউইন উদযাপন কিন্তু অন্য দেশের থেকে একেবারেই আলাদা। বাড়ির ফায়ারপ্লেসের পাশে এ দিন রাতে পরিবারের প্রত্যেক মৃত সদস্যের জন্য চেয়ার সাজিয়ে রেখে ঘুমোতে যান সকলে। তাঁদের বিশ্বাস, হ্যালোইনের রাতে মৃত সদস্যদের আত্মারা নেমে এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে যান।
লাতিন আমেরিকায় ‘অল সোলস ডে’ পালিত হয় ‘ডে অফ দ্য ডেড’ নামে। মেক্সিকো ও স্পেনে নভেম্বর মাসের প্রথম দু’দিন পালিত হয় মৃতদের দিন। এই দু দিন মৃতদের সমাধিক্ষেত্রে শ্রাদ্ধা জানানোর পরই সকলে মেতে ওঠেন উৎসবে। উৎসবের এই রীতি প্রায় হাজার বছরের প্রচীন।
জাপানে এই উৎসব ‘ফেস্টিভ্যাল অফ হাঙ্গরি ঘোস্টস’। জাপানে ভূতেদের উৎসব চলে গোটা গরমকাল জুড়েই। এই সময় সারা রাত আগুন জ্বালিয়ে রাখেন জাপানিরা। এই সময় সারি সারি লাল কাগজ বা কাচের তৈরি লন্ঠনে সেজে ওঠে রাস্তার দু পাশ।
চিনা বছরের শেষে পালিত হয় ‘তেঙ্গ চেইহ’, যার অর্থ হল লন্ঠন উৎসব। বিভিন্ন পশুপাখির আকারে তৈরি লাল, হলুদ, সবুজ কাগজ বা কাচ দিয়ে তৈরি করা হয় সেই লন্ঠনগুলো। এই ‘তেঙ্গ চেইহ’ উৎসবের সময় জাপানের মতোই লন্ঠন জ্বালিয়ে অশুভ শক্তি দূর করে চিনারা।
আর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কালীপূজা, অর্থাৎ দীপান্বিতা অমাবস্যার আগের রাতে ভূত চতুর্দশী পালন করেন। চোদ্দ পুরুষের উদ্দেশে এ দিন সন্ধ্যায় জ্বালানো হয় চোদ্দ প্রদীপ। খাওয়া হয় চোদ্দ শাকও।
মৃত্যুর পর কী রয়েছে, তা জানার অদম্য কৌতূহল সারা পৃথিবী জুড়ে। ভূত চতুর্দশী হোক কিংবা হ্যালোইন অথবা অল সোলস’ ডে, সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ দিবস উৎসর্গ করা হয় “ভূত”কে। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ যখন হারিয়ে যাওয়া সময়কে উদযাপন করে হাতে হাত রেখে।
তবে ‘ভূত’ শব্দটাই তো আদতে পরস্পরবিরোধী। একদিকে বিশেষণ অর্থে ভূত মানে অতীত; যা প্রাক্তন হয়ে গেছে। আবার ভূত তো পঞ্চভূত-ও বটে; যা প্রকটভাবে বর্তমান। বাংলা পঞ্জিকায়, ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ভূত চতুর্দশী, হ্যালোইন, অল সোলস’ ডে প্রতিবছর নিয়ম করে আসে। কিন্তু চলে যাওয়া পূর্বপুরুষরা আর ফিরে আসেন না। তাঁদের স্মরণ করার বিশেষ দিবস উদযাপনের মাধ্যমে আসলে তাঁদের শূন্যতার বিপ্রতীপে নিজেদের অস্তিত্বকে আর একবার স্বীকৃতি দেওয়া, অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
আকাশপ্রদীপ অথবা চোদ্দ প্রদীপের শিখায় কিংবা গোরস্থানে মোমবাতির আলোয় আধো-অন্ধকারে আচমকাই কোনও আবছায়া দেখে চমকে ওঠার মুহূর্তে হঠাৎ করেই মনে হতে পারে, আছে আছে, সব আছে; সব সত্যি। তা সে ভূত চতুর্দশীর বাঙালি ভূত হোক বা হ্যালোউইনের সাহেব ভূত।









