রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কার্যক্রমে হাসি ফুটছে অসংখ্য পিংকিদের মুখে

।। পারিজাত দত্ত ।।
অনলাইন ডেস্ক, ২৬ সেপ্টেম্বর,২০২৪: বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত একদিন অকস্মাৎ আগুনে ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেল মাতাবাড়ির বাসিন্দা পিংকির। হাতে নেই একটি টাকাও। বিপদের দিনে সংসার ছেড়ে চলে গেছেন স্বামীও। ছেলের হৃদযন্ত্রে ফুটো। অস্ত্রোপচারে রাজি নয় পরিবারের লোকজন। ঝুঁকি নিয়ে অপারেশন করাতে বণ্ডে সই করলেন পিংকি। সেই মুহূর্তে পিংকি ভয় পাচ্ছিল অস্ত্রোপচার যদি সফল না হয় তখন কী করবে সে? সেই মুহূর্তে তার যা মনের অবস্থা, সেই দোলাচল যেন আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তার গলায়।

পিংকি বলছিলেন, তার ছেলে দেবব্রতর কথা। দেবব্রতর ডাক নাম কৃষ্ণ, বয়স ১৩ বছর। মাতাবাড়ি অমরনগর স্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। জন্মের পর তার যখন ২১ দিন বয়স তখনই ধরা পড়েছিল তার হৃদযন্ত্রে গোলযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ও হাসপাতালে দেখানো হয়েছিল দেবব্রতকে। অস্ত্রোপচার করতে হবে জেনে শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামী বাধা দেয়।

তার যখন বয়স আট কিংবা নয়, তখন একবার এসেছিল আরবিএসকে টিম। বলেছিল বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের কথা। কিন্তু তখনও তার বাবা রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অপারেশন করা আর হয়ে উঠেনি। স্কুল থেকে ফিরে অনেক সময় বুকে অসম্ভব ব্যথা করছে, বলত সে। কিন্তু তার বাবা রাজি না থাকায় ছেলের জন্য পিংকি কিছুই করতে পারছিলেন না। মাতাবাড়িতে ভাড়া বাড়িতে ছেলে ও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে স্বামী স্ত্রী থাকতেন।- পিংকির স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন।

কখনও কখনও আবার ট্রাক্টরও চালান। আর পিংকি গৃহ পরিচারিকা। গত পৌষ মাসে এক শীতের দুপুরে কাজ সেরে বাড়ি ফিরে ছেলে মেয়ের- জন্য গরম পোশাক কিনবে বলে বাড়ি থেকে বের হন পিংকি। কী মনে করে যেন ছেলে ও মেয়ে দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর খবর পেলেন বাড়িতে আগুন লেগেছে।

এক ছুটে বাড়ি ফিরে দেখলেন বাড়িতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। পাশের ভাড়াটিয়া ঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। কোনও কিছুই ঘর থেকে বের করতে পারেননি পিংকি। সর্বগ্রাসী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তার যাবতীয় সম্বল। পিংকির কথায়, এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। সেই কাপড়খানিই ছিল আমাদের সম্বল। আর কিছুই নয়। পিংকি ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে তার স্বামী থাকতেন ভাড়া বাড়িতে। এবার স্বামী চলে গেল তার নিজস্ব বাড়িতে, বাবা মায়ের কাছে।

সেখানে আর যাওয়া হয়নি পিংকি ও তার ছেলেমেয়েদের। তাদের নিয়ে শুরু হলো পিঙ্কির বেঁচে থাকার লড়াই। ছেলের শরীরের অবস্থা তখন খারাপ। পিংকি ঠিক করলো যেভাবেই হোক ছেলেকে সুস্থ করে তুলবে। সে নিজেই যোগাযোগ করলো গোমতী জেলার আরবিএসকে টিমের সঙ্গে।

এলাকারই একটি শিশু আরবিএসকে টিমের সহযোগিতায় ব্যাঙ্গালোরে অপারেশন করে সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছে। তাদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে পিংকি ছুটলেন রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কার্যক্রমের চিকিৎসক দলের সঙ্গে কথা বলতে। ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই ত্রিপুরা সুন্দরী হাসপাতালের আরবিএসকে টিম স্ক্রিনিং করল তার। ধরা পড়লো হৃদযন্ত্রে দুটো ফুটো রয়েছে দেবব্রতের। পরীক্ষা করে তড়িঘড়ি তার অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করলেন ডাঃ নন্দন দেবনাথের নেতৃত্বে মেডিকেল টিম। ২০২৩ সালের ২৫ জুলাই অস্ত্রোপচারের তারিখ ঠিক হলো।

সে সময় পাহাড় যেন ভেঙে পড়ল পিংকির মাথায়। হাতে টাকা নেই তার। যদিও আরবিএসকের কল্যাণে অস্ত্রোপচারের জন্য কোনও টাকা খরচ হবে না। কিন্তু তাদের যাতায়াত, আগরতলায় থাকাখাওয়া-, সমস্ত কিছু মিলিয়ে কিছু টাকা তো দরকার। এই টাকা জোগাড় করবার জন্য টেনশন। তার উপর অস্ত্রোপচার যদি ব্যর্থ হয়, তখন কি হবে, সেটা ভেবেও মাথা নষ্ট হয়ে যাবার যোগাড় তার। ছেলের কথা যেমন ভাবতে লাগলেন, তেমনি নিজের কথাও ভাবতে লাগলেন তিনি।

তার কথায় আমার ছেলের যদি অস্ত্রোপচার ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাকে মাতাবাড়ি এলাকা ছাড়া তো করবেই, আমাকে বাঁচতেও দেবে না আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। হাসপাতালে অপারেশনের আগে যখন বণ্ডে সই করছিলাম, তখন আমার সে কি যন্ত্রণা, কি কষ্ট, সেটা বলে বুঝাতে পারব না ।

ডাক্তার বাবুরা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বুঝিয়ে ছিলেন যে কোনও ভয় নেই। ছেলে আমার ভালো হয়ে যাবে। আইএলএস হাসপাতালে অপারেশন হলো। এখন ছেলে ভালো হয়ে গেছে অনেকটাই। কথা বলতে বলতে গলা আবেগে বুজে এলো তার। বললেন, রক্ত দিয়েও ঋণ শোধ করতে পারবো না এই ডাক্তারবাবুদের।

তাদের জন্যই আমার ছেলে ভালো হয়ে ফিরে এসেছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে অপারেশনের পর আগস্ট মাসে, তারপর অক্টোবর মাসে এবং নভেম্বর মাসে আরবিএসকে টিম এসে ছেলের শরীরের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গেছে। সম্প্রতি আবারও এসেছিল আরবিএসকে টিম। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গেছে কৃষ্ণকে। দিয়ে গেছে পরামর্শও।

আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। ফার্মাসিস্ট রাজেশ ভৌমিককে নিয়ে ডাঃ নন্দন দেবনাথ বারবার গিয়েছেন সেখানে পরীক্ষা করেছেন তাকে। ২১ আগস্ট, ২০২৪ এও ডাঃ নন্দন দেবনাথ ফোন করে খবর নিয়েছেন দেবব্রতর। সে এখন সুস্থ। রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কার্যক্রমের মেডিকেল টিম এই ভাবেই হাসি ফুটিয়ে চলেছে অসংখ্য পিংকিদের মুখে। • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর থেকে এই ফিচারটি দেওয়া হয়েছে।

 

Recent Posts