অনলাইন ডেস্ক, ১৯ আগস্ট, ২০২৬: ত্রিপুরার শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের অবদান ছিল অপরিসীম। মহারাজার এই ইতিহাসকে বিগত দিনে সুপরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের কাছে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বিরাসত ভি, বিকাশ ভি’—ঐতিহ্যও, উন্নয়নও—মন্ত্রকে পাথেয় করে মহারাজা বীর বিক্রমের প্রকৃত গৌরবগাথা এবং তাঁর অবদানকে জনসমক্ষে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে নুতন প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারছে।
আজ রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুরের ১১৮তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত রাজ্যভিত্তিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা একথা বলেন। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মহারাজার দূরদর্শী চিন্তা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং উন্নয়ন ভাবনার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই আধুনিক ত্রিপুরার ভিত গড়ে উঠেছিল।মহারাজা বীর বিক্রমের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৯৩৫ সালে মহারাজা আগরতলা পুরসভা গঠন করেছিলেন, যা ভারতের প্রাচীনতম পুরসভাগুলোর অন্যতম।
ট্রেজারি স্থাপন এবং ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন রাজ্যে আর্থিক শৃঙ্খলার ভিত তৈরি করেছিলেন। তাঁর সেই উন্নয়ন ভাবনাকে অনুসরণ করেই বর্তমান সরকার রাজ্যের পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মহারাজা বীর বিক্রমের অবদানের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মহারাজাই ত্রিপুরায় উচ্চশিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এমবিবি কলেজ থেকে আজকের এমবিবি বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, আর্ট কলেজ সহ শিক্ষাক্ষেত্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পিছনে তাঁর দূরদর্শী চিন্তার অবদান রয়েছে। তৎকালীন সময়ে জার্মানি, আমেরিকা ও ইতালি সফর করে তিনি বিশ্বমানের শিক্ষা ও স্থাপত্যের ধারণা অর্জন করেছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে ত্রিপুরার উন্নয়নে কাজে লাগিয়েছিলেন।
বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ত্রিপুরার ঐতিহাসিক ও আত্মিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য থেকে মহারাজা বীর বিক্রম মাণিক্যের সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কবিগুরুকে ‘ভারত ভাস্কর’ উপাধিতে ভূষিত করার মধ্য দিয়ে মাণিক্য রাজবংশের মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলা ও ত্রিপুরার মধ্যে যে আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, তা মাণিক্য রাজবংশই সুদৃঢ় করেছিল। ১৯৪১ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মহারাজা বীর বিক্রম দুর্গত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, যা মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মহারাজা ও মাণিক্য রাজাদের আমলে তৈরি ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে সেগুলিকে রাজ্যের পর্যটন ও অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করার উপরও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে রাজ্য সরকার। তিনি বলেন, ত্রিপুরার পর্যটনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদ, নীরমহল এবং কসবা কালী মন্দিরের উন্নয়নে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে আগরতলার পুষ্পবন্ত প্যালেসকে ফাইভ-স্টার হোটেলে গড়ে তোলার কাজও চলছে। পাশাপাশি আগরতলা, উদয়পুর ও ধর্মনগরকে কেন্দ্র করে ‘স্যাটেলাইট টাউন’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা বর্তমানে অপরাধের হার হ্রাসের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থানে রয়েছে। ফলে রাজ্যে শান্তির পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে নিরন্তর প্রয়াস চলছে, তার ইতিবাচক প্রতিফলন আজ সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। উগ্রপন্থার পথ ছেড়ে বহু যুবক জীবনের মূলস্রোতে ফিরে এসেছে এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার বিশেষ প্যাকেজও ঘোষণা করেছে।
জনজাতি অংশের মানুষের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন প্রকল্প খাতে বরাদ্দ আগের থেকে অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে । বাজেটের হিসাব ছাড়াও জনজাতি এলাকার উন্নয়নে আরো অনেক বেশি খরচ করা হচ্ছে। রাজ্যে অনেক জাতীয় সড়ক নির্মিত হচ্ছে, যেগুলো বেশিরভাগ জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাকে অতিক্রম করছে।মহারাজা বীর বিক্রমের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে জনজাতি অংশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের উপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত এবং বিকশিত ত্রিপুরা গড়ে তোলার যে লক্ষ্য বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে, তার অন্যতম অনুপ্রেরণা মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের দূরদর্শী চিন্তা ও উন্নয়ন ভাবনা। মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই তাঁর জন্মদিন পালনের প্রকৃত সার্থকতা আসবে।
অনুষ্ঠানে শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের মন্ত্রী সান্ত্বনা চাকমা বলেন, মহারাজা বীর বিক্রম কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন আধুনিক ত্রিপুরার স্বপ্নদ্রষ্টা। শিক্ষা, যোগাযোগ, নগর পরিকল্পনা ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর দূরদর্শী চিন্তা আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। প্রকৃত উন্নয়ন কেবল রাস্তা বা অট্টালিকা নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের মধ্যে শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশেই মহারাজা বিশ্বাসী ছিলেন।মন্ত্রী বলেন, বিগত দিনে মহারাজার জন্মজয়ন্তী পালনে কোন সদিচ্ছা দেখা যায়নি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মহারাজাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে। তাঁর জন্মদিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং আগরতলা বিমানবন্দর তাঁর নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রী এছাড়াও তার ভাষণে জনজাতি কল্যাণে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বিধায়ক অভিষেক দেবরায় বলেন, মহারাজা বীর বিক্রম যখন উচ্চশিক্ষার কথা ভেবেছিলেন, তখন ত্রিপুরায় এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো প্রায় ছিল না। মহারাজা উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি রাজ্যের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অট্টালিকা বা রাজপ্রাসাদ নির্মাণের মাধ্যমে সম্ভব নয়; শিক্ষার আলোই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এমবিবি কলেজ এবং অসংখ্য বিদ্যালয় আজও ত্রিপুরার শিক্ষার মেরুদণ্ড হয়ে রয়েছে।বিধায়ক বলেন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন মহারাজা বীর বিক্রম। তাঁর মন্ত্রিসভায় জনজাতি ও বাঙালি উভয় অংশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ছিল। শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্তে মহারাজা বীর বিক্রমকে একজন মহান দূরদর্শী, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ত্রিপুরাকে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মহারাজা নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও সচিব তার ভাষণে ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগের সন্ধিক্ষণে মহারাজার জাতীয়তাবাদী ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান এবং সমৃদ্ধ বৌদ্ধ ও জনজাতি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ড. ধাম্মাপিয়াকে মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুর স্মৃতি পুরস্কার-২০২৬ প্রদান করা হয়। পুরস্কারস্বরূপ মুখ্যমন্ত্রী তাঁর হাতে শাল, স্মারক, মানপত্র এবং ১ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা সহ অন্যান্য অতিথিগণ মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনুষ্ঠানে মহারাজার জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার।
এদিন সকালে কামান চৌমুহনিস্থিত ‘জিরো পয়েন্ট’-এ স্থাপিত মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের মর্মর মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার সহ কর্পোরেটরগণ।









