অনলাইন ডেস্ক, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬: আর্থিকভাবে দুর্বল ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাধারণ মানুষের পাকা বাড়ির স্বপ্নপূরণ এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে লাইট হাউস প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আজ আখাউড়া বর্ডারস্থিত আগরতলা লাইট হাউস প্রকল্পের ‘এ’ ও ‘এফ’ ব্লকের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী নবনির্মিত ব্লক দুটি পরিদর্শন করেন। পরে অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্লক দুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি। এই পর্যায়ে ২৭৮টি আবাসন উপভোক্তাদের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে কয়েকজন উপভোক্তার হাতে নতুন আবাসনের চাবি তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টার।
উদ্বোধকের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, লাইট হাউস প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বিভিন্ন সময়ে কিছু প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং সবার সহযোগিতায় সেই জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। সাতটি ব্লকের মধ্যে দুটি ব্লকের উদ্বোধন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাকি ব্লকগুলির কাজও সম্পন্ন করে উপভোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। প্রকল্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টারের সহযোগিতার জন্য ত্রিপুরাবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের প্রকল্পগুলির মধ্যে লাইট হাউস প্রকল্প অন্যতম। আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত, উন্নতমানের, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নির্মাণের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ছয়টি শহরের সঙ্গে আগরতলাকেও এই প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলিকে একটি স্থায়ী আবাসন দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের জীবনে নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন একটি পাকা বাড়ি শুধু আশ্রয় নয়, বরং একটি পরিবারের সুস্থ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ভিত্তি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগরতলার লাইট হাউস প্রকল্পে মোট এক হাজারটি আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় ৩০ বর্গমিটার বা ৩২০ বর্গফুট। আধুনিক ‘লাইট গেজ স্টিল ফ্রেম’ প্রযুক্তিতে নির্মিত এই আবাসনগুলি উন্নত নির্মাণ পদ্ধতি, স্থায়িত্ব ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত। বড় বড় শহরেও সাশ্রয়ী মূল্যে এই ধরনের উন্নত আবাসন পাওয়া কঠিন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে আধুনিক আবাসনের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আবাসন প্রকল্পের পাশাপাশি নাগরিকদের প্রয়োজনীয় পরিষেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উপরও গুরুত্বারোপ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একটি পরিকল্পিত আবাসন এলাকা গড়ে তুলতে উন্নত পরিকাঠামোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, সুস্থ পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও জরুরি। এখানে যারা বসবাস করবেন পরিবারগুলিকে আবাসন এলাকাটিকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে তোলার জন্য সম্মিলিতভাবে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, লাইট হাউস প্রকল্পের ‘এ’ ও ‘এফ’ ব্লকের উদ্বোধন আগরতলায় আধুনিক ও সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থার সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ২৭৮টি পরিবারের জন্য নতুন আবাসনের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি রাজ্যের নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অতীতে ত্রিপুরা সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা কাটিয়ে বর্তমানে রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ গড়ে উঠেছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীরা ত্রিপুরায় আসছেন, রাজ্যের উন্নয়নের সম্ভাবনা ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রাজ্য সরকার একদিকে যেমন সরকারি ক্ষেত্রে নিয়মিত চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে আউটসোর্সিং ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতিমধ্যে রাজ্যে ২৩ হাজারেরও বেশি নিয়মিত চাকরি দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টার বলেন, আগরতলার লাইট হাউস প্রকল্পের দুটি ব্লকের উদ্বোধন শুধু আবাসন নির্মাণের একটি পর্যায় সম্পন্ন হওয়া নয়, বরং ২৭৮টি পরিবারের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। পাকা বাড়ির স্বপ্ন পূরণের মধ্য দিয়ে পরিবারগুলি আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনযাপনের সুযোগ পাবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে ‘গ্লোবাল হাউসিং টেকনোলজি চ্যালেঞ্জ ইন্ডিয়া’ শুরু হয়। আধুনিক, টেকসই, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত উন্নতমানের আবাসন তৈরি করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। দেশের বিভিন্ন শহরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নতুন নির্মাণ প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
আগরতলার লাইট হাউস প্রকল্পও সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি আরও জানান, প্রকল্পে আধুনিক নির্মাণ ব্যবস্থার পাশাপাশি কমিউনিটি সেন্টার, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জল সরবরাহ এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত আলোর মতো বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নগর উন্নয়ন দপ্তরের সচিব ড. মিলিন্দ রামটেকে। তিনি প্রকল্পের গুরুত্ব এবং আবাসন পরিকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আগরতলা পুর নিগমের কমিশনার মিহির কান্তি গোপ। অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব কিরণ গিত্তে, বিএমটিপিসির নির্বাহী অধিকর্তা অরবিন্দ কুমার প্রমুখ।








