অনলাইন ডেস্ক, ১জুলাই, ২০২৬: গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করার ক্ষেত্রে প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যে দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাণী চিকিৎসা পরিষেবার সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাণীপালনকে লাভজনক জীবিকায় পরিণত করার লক্ষ্যে দপ্তর ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে। এরই ফলস্বরূপ ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির বাস্তবায়নে সাফল্যের হার প্রায় ৯৭.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আজ সচিবালয়ের প্রেস কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রাণীসম্পদ বিকাশ দপ্তরের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে প্রাণী সম্পদ বিকাশ, মৎস্য এবং তপশিলী জাতি কল্যাণ মন্ত্রী সুধাংশু দাস একথা বলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানান, গত তিন বছরে রাজ্যে দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। তিনি জানান, বর্তমানে রাজ্য দুগ্ধ উৎপাদনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
প্রাণী চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রসঙ্গে প্রাণীসম্পদ বিকাশ মন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজ্যের ৫৮৬টি পশু চিকিৎসা কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৬৩.৯৭ লক্ষ গবাদি পশু ও হাঁস-মোরগের চিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধমূলক পরিষেবা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও, প্রাণীদের রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১১.৮৪ লক্ষ এফএমডি টিকা এবং ৮০ লক্ষেরও বেশি হাঁস-মোরগকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, কৃষকদের দোরগোড়ায় জরুরি প্রাণী চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে বর্তমানে রাজ্যে ১৩টি মোবাইল ভেটেরিনারি ইউনিট কাজ করছে। এই পরিষেবাকে আরও সম্প্রসারিত করতে ৫০টি নতুন মিনি মোবাইল ভেটেরিনারি ইউনিট চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, ‘ভারত সঞ্জীবনী’ প্রকল্পের আওতায় চালু হওয়া কল সেন্টারের মাধ্যমে কৃষকরা ১৯৬২ টোল-ফ্রি নম্বরে ফোন করে দ্রুত ও জরুরি প্রাণী চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছেন।
দুগ্ধ খাতের উন্নয়নের বিষয়ে প্রাণীসম্পদ বিকাশ মন্ত্রী জানান, গত অর্থবছরে ১,২৩,১৫৮টি গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজনন সম্পন্ন হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির সেক্স-সর্টেড সিমেন ব্যবহারের ফলে ১৪,২৯৮টি বাছুরের জন্ম হয়েছে, যার অধিকাংশই স্ত্রী বাছুর এবং ভবিষ্যতে রাজ্যের দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি, ৫০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকিতে ৮,০০০ বাছুরের জন্য পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হয়েছে এবং এনইসি প্রকল্পের আওতায় ১৪১টি উচ্চ দুধ উৎপাদনকারী গাভী বিতরণ করা হয়েছে। শ্রীদাস জানান, রাজ্যের দুগ্ধ শিল্পের পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে বামুটিয়ায় দৈনিক ৪০ হাজার লিটার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক মিল্ক প্রসেসিং প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে। কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে আর. কে. নগরে একটি লিক্যুইড নাইট্রোজেন প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে এবং উদয়পুর ও কুমারঘাটে আরও দুটি লিক্যুইড নাইট্রোজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।
এছাড়াও, রাজ্যে দুগ্ধ সমবায় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং চাষিদের আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তর ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড এবং গোমতী মিল্ক ইউনিয়নের মধ্যে ‘শ্বেত বিপ্লব ২.০’ কর্মসূচির আওতায় একটি ত্রিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পশুখাদ্যের ঘাটতি দূর করতে রাজ্য ফডার টাস্ক ফোর্সের সহায়তায় একটি উন্নত ফডার রিসোর্স প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২২০ হেক্টর জমিতে উন্নত ঘাসের চাষ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৫,৪৭০ মেট্রিক টন সবুজ ঘাস উৎপাদন সম্ভব হয়েছে এবং ১,৫৫৫ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি খামার এবং কৃষকদের বাড়ির আঙিনায় ১৫ টন পুষ্টিকর ‘আজোলা’ উৎপাদন করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য লাইভস্টক উন্নয়নে ও রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিম উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যেও রাজ্যে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এমপিএসবিওয়াই এবং এমএমটিজেবিওয়াই প্রকল্পের আওতায় রাজ্যে ১৪,৩৪৮টি মোরগ পালন পোল্ট্রি ইউনিট এবং ২,৬৭৮টি হাঁস পালন ইউনিট সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রাণীসম্পদ বিকাশ মন্ত্রী জানান, প্রাণী পালকদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাণী পালক সম্মান নিধি যোজনার আওতায় ৫,০০০ জন প্রাণী পালককে বছরে ৬,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও, লাইভস্টক ইনসুরেন্স স্কিমের আওতায় ১৬,০০৫টি প্রাণীর বিমা করা হয়েছে এবং প্রাণীর মৃত্যুর পর ১৪৫টি দাবির নিষ্পত্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি, দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক কারণে গবাদি পশু বা পাখির মৃত্যু হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে ‘আনন্যাচারাল ডেথ কম্পেনসেশন স্কিম’ চালু রয়েছে, যার আওতায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই প্রকল্পের আওতায় ১৭২ জন কৃষককে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রাণী পালকদের সুবিধার্থে আর, কে. নগর ভেটেরিনারি হাসপাতাল এবং টিভিসিসি-তে বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার চিকিৎসা পরিষেবা চালু রয়েছে। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজ্যে ১১টি নতুন ভেটেরিনারি ডিসপেনসারি, ৩টি ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ২৬টি ভেটেরিনারি সাব-সেন্টার এবং ৪টি পশু ওষুধের দোকান (মেডিসিন স্টোর) নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি জানান। সাংবাদিক সম্মেলনে এছাড়াও দপ্তরের সচিব দীপা ডি. নায়ার এবং অধিকর্তা ড. নিরজ কুমার চঞ্চল উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।







