নেশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাতিয়ার যেখানে ফুটবল

অনুপম পাল
অনলাইন ডেস্ক, ৫ অগাস্ট,২০২৬: সন্ধ্যা নামতেই আলোয় ভেসে উঠেছিল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠ। চারদিকে অন্ধকার, অথচ ফ্লাডলাইটের আলোয় ঝলমল করছে কাদা-মাটির ফুটবল মাঠ। নেই গ্যালারি, আধুনিক স্টেডিয়াম কিংবা আর্টিফিশিয়াল টার্ফ। তবুও দর্শকের ভিড়ে ঠাসা চারপাশ। মাঠে তখন ছুটে চলেছেন একদল তরুণ কারও চোখে জয়ের স্বপ্ন, কারোর পায়ে গোলের তাগিদ। তবে এই ম্যাচের আসল লড়াইটা হয়তো স্কোরবোর্ডে লেখা নেই। কারণ এখানে প্রতিটি গোল যেন নেশার বিরুদ্ধে একেকটি বার্তা। দক্ষিণ ত্রিপুরার ঋষ্যমুখ ব্লকের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ মতাই গ্রামের এই ছবি এখন ত্রিপুরার নেশামুক্তির লড়াইয়ের এক উদাহরণ হয়ে উঠছে। ফুটবলকে হাতিয়ার করে যুবসমাজকে নেশা থেকে দূরে রাখার এই উদ্যোগের নাম ‘দক্ষিণ ত্রিপুরা নেশামুক্ত ফুটবল প্রিমিয়ার লিগ ও মাড ফুটবল লিগ’। দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলা প্রশাসনের নেশামুক্তি অভিযানের অন্যতম বিশেষ উদ্যোগ এটি। মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহার ‘নেশামুক্ত ত্রিপুরা’ গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০২৩ সালে এই উদ্যোগের পথচলা শুরু হয়।

উদ্দেশ্য একেবারেই স্পষ্ট বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকার যুবক-যুবতীদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করা, তাদের প্রতিভার বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া এবং একইসঙ্গে নেশার অন্ধকার থেকে দূরে রাখা। নেশার বিরুদ্ধে পুলিশ, বি এস এফ, আসাম রাইফেলস, টিএসআর-সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান চলছে। পাশাপাশি প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরেও রাজ্যজুড়ে চলছে বহুমুখীজনসচেনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ। দক্ষিণ ত্রিপুরার সেই লড়াই এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে ফুটবলের হাত ধরে। গত ৩১ জুলাই দক্ষিণ ত্রিপুরা নেশামুক্ত প্রিমিয়ার লিগ ৪.০-এর সূচনার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ ত্রিপুরা নেশামুক্ত মাড ফুটবল টুর্নামেন্ট ২.-এর ফাইনাল। ২৭ থেকে ৩১ জুলাই দক্ষিণ মতাই গ্রামে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় মোট ২৬টি দল। তবে সব দলের মধ্যে একটি দলের গল্প ছিল অন্যরকম ‘রিহ্যাব টিম’। দলের কয়েকজন খেলোয়াড় একসময় মাদকের আসক্তির সঙ্গে লড়াই করেছেন। আজ তারাই ফিরে এসেছেন ফুটবল মাঠে। তাদের হাতে এখন নেশার সামগ্রী নয়, ফুটবল। সামনে অন্ধকার নয়, নতুন জীবনের স্বপ্ন। তাই তাদের কাছে এই টুর্নামেন্ট শুধুই প্রতিযোগিতা নয়, নিজেদের ফিরে পাওয়ারও এক লড়াই। ফাইনালে মুখোমুখি হয় জোলাইবাড়ি সেভেন স্টার ও বকাফা বাস্টার। কাদা মাটির মাঠে উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ের শেষে চ্যাম্পিয়ান হয় জোলাইবাড়ি সেভেন স্টার। তবে সেদিন ম্যাচের ফলাফল যেন গৌণ হয়ে গিয়েছিল। সীমান্তের ছোট এই গ্রামে ফটবলকে ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনাই হয়ে উঠেছিল বড আকর্ষণ।

ফ্লাডলাইটের আলোয় মাটির মাঠ, চারপাশে হাজারো দর্শকের ভিড়, আক্রমণ ও প্রতি আক্রমনে গোলের সঙ্গে উচ্ছ্বাস-সব মিলিয়ে দক্ষিণ মতাইয়ের রাতটি পরিণত হয়েছিল এক অন্যরকম উৎসবে। ফাইনাল ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা। তিনি যুবসমাজকে মাদক ও নেশার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী গ্রাম ও বিভিন্ন মিশ্র জনবসতি এলাকার যুবসমাজের মধ্যে সুস্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আনতে তৃণমূল স্তরে খেলাধুলার প্রসারের উপর গুরুত্বারোপ করেন। এই উদ্যোগ যে শুধু একটি টুর্নামেন্টে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তার ইঙ্গিতও মিলেছে দক্ষিণ ত্রিপুরার জেলাশাসক মোঃ সাজাদ পি-এর বক্তব্যে। তিনি জানান, নেশার বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও শক্তিশালী করতে আগামী দিনে সারা বছর ব্যাপী একটি সুনির্দিষ্ট ফুটবল লিগ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই এই ফুটবল ম্যাচের ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে একাধিক ভিডিও পেয়েছে বিপুল ভিউ বা প্রশংসা। সীমান্তের প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণদের এই প্রিয় ফুটবল খেলা পৌঁছে গেছে বহু মানুষের কাছে।

আর এখানেই এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সফলতা যে যুবকটি হয়তো একসময় সমাজে নেশাগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত ছিল আজ মানুষ তাকে দেখছেন একজন খেলোয়াড় হিসেবে। যে গ্রামকে হয়তো আগে অনেকেই চিনতো না, সেই গ্রামের নাম এখন ফুটবলের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে বহু মানুষের কাছে। প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু খেলোয়াড় তৈরি করা নয়, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার তরুণ-তরুণীরা নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে, খেলাধূলার সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং নেশার কু-ফল থেকে দূরে থাকবে। দক্ষিণ মতাইয়ের এই মাড ফুটবল তাই কেবল একটি খেলার উদাহরণ নয়। এটি পরিবর্তনের গল্প, নিজেকে চেনার গল্প, ফিরে আসার গল্প, নতুন স্বপ্ন দেখার গল্প। আর সেই গল্পে প্রতিটি গোল যেন একটাই কথা বলে- ‘নেশার বিরুদ্ধে লড়াই, সীমান্তের মাঠে ফুটবলের জয়’। আসলে ফুটবলসহ অন্যান্য খেলাধুলা আজ নেশার বিরুদ্ধে নতুন আলোকের সন্ধান দিয়েছে। নেশার বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা রাজ্যের যুবক-যুবতীকে আজ জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসার রসদ জুগিয়েছে।

Recent Posts