হাওড়া রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী, আগরতলাকে আরও উন্নত, সবুজ, পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে

অনলাইন ডেস্ক, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: আধুনিক আগরতলার সঙ্গে সংযোজিত হলো আরও একটি নতুন পালক। হাওড়া নদীর তীরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নান্দনিক ও আধুনিক রিভারফ্রন্ট শহরবাসীর কাছে এক নতুন উন্নয়নের পরিচয় বহন করছে। একসময় যেখানে বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে নদীর তীর ব্যবহৃত হতো, আজ সেখানেই তৈরি হয়েছে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব জনপরিসর। আজ হাওড়া রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা। হাওড়া নদীর বটতলা সংলগ্ন তীর এই প্রকল্পে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হাওড়া নদী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আগরতলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে এমন একটি জনপরিসর তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃতি, বিনোদন, শরীরচর্চা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। আগরতলা স্মার্ট সিটি মিশনের আওতায় ২০১৫ সালে আগরতলা দেশের ১০০টি শহরের মধ্যে স্থান পাওয়ার পর থেকে রাজধানীর নগর পরিকাঠামো উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগরতলাকে স্মার্ট সিটি মিশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে রাজধানীর আধুনিক নগর উন্নয়নের স্বপ্ন দেখানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের আগে মুখ্যমন্ত্রী হাওড়া রিভারফ্রন্টের নবনির্মিত এলাকা পরিদর্শন করেন। প্রকল্পের বিভিন্ন পরিকাঠামো, নাগরিক সুবিধা, নদীর তীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যায়নের কাজ ঘুরে দেখেন তিনি এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রকল্পের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্টিল ব্রিজ থেকে দশমীঘাট পর্যন্ত প্রায় ১,৭০০ মিটার দীর্ঘ অংশকে আধুনিক রিভারফ্রন্ট হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নদীতীরের স্থায়িত্ব ও সুরক্ষার জন্য গ্যাবিয়ন ওয়াল, মাইক্রো পাইল, জিও টেক্সটাইল ও টো ওয়াল-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাঁচ বছরের অ্যানুয়াল মেইনটেন্যান্স কনট্রাক্ট-এর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

নাগরিকদের সুবিধার কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রিভারফ্রন্টে রয়েছে ওয়াকিং পাথ, সাইকেল লেন, ভিউয়িং ডেক, এলিভেটেড ওয়াকওয়ে, ওপেন জিম, যোগা স্পেস এবং জিপলাইন-এর মতো বিভিন্ন সুবিধা। শিশুদের জন্য প্লেগ্রাউন্ড, পাখিদের জন্য বার্ড অ্যাভিয়ারি, নেচার ট্রেইল, ফুড প্লাজা, আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট ভিলেজ-সহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক ও সামাজিক পরিসরও তৈরি করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য গোটা এলাকায় সিসিটিভি নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা সিটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার-এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য রিভারফ্রন্ট খোলা থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাওড়া নদী ও তার তীর সংরক্ষণ। নদী ভাঙন ও জলাবদ্ধতার সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

খেলাধুলা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি ও সুস্থ জীবনযাপনের পরিবেশ গড়ে তুলতেও এই রিভারফ্রন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারের তৈরি করা এই পরিকাঠামোকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা নাগরিকদেরও দায়িত্ব। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে রিভারফ্রন্ট ও তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য তিনি শহরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগরতলাকে আরও উন্নত, সবুজ, পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভারত, উন্নত ভারত এবং উন্নত ত্রিপুরা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। হাওড়া রিভারফ্রন্ট প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিক, কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তিনি অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার বলেন, হাওড়া রিভারফ্রন্ট শুধু একটি সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প নয়, এটি হাওড়া নদীকে সংরক্ষণ করে আগরতলা শহরের জন্য একটি নতুন জনপরিসর তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় আগরতলা স্মার্ট সিটি লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে বলে তিনি জানান। নদীতীরের ৩৭টি পরিবারকে রাধানগরে পুনর্বাসন দেওয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁদের পাকা ঘর, স্থানান্তর খরচ এবং জীবিকার সহায়তার জন্য নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও মেয়র তুলে ধরেন। নবনির্মিত রিভারফ্রন্টের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। অনুষ্ঠানে হাওড়া রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের উপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের উদ্যোগে আয়োজিত একটি রক্তদান শিবির পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য অতিথিগণ। তাঁরা রক্তদাতাদের উৎসাহিত করেন এবং এই মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নগরোন্নয়ন দপ্তরের সচিব ড. মিলিন্দ রামটেকে। উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক মিনা রাণী সরকার, আগরতলা পুরনিগমের ডেপুটি মেয়র মণিকা দাস দত্ত, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব তথা অন্যান্য দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্তে, পুরনিগমের কমিশনার সাজু বাহিদ এ, আগরতলা স্মার্ট সিটি লিমিটেডের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক জি. নায়েক প্রমুখ।

Recent Posts