ত্রিপুরা লাইভলিহুড মিশন দক্ষতা স্বনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদা অর্জনের পথ

।। গৌতম দাস ।।

অনলাইন ডেস্ক, ১২ জুন, ২০২৫: ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশন হল একটি সরকারি উদ্যোগ যা রাজ্যের শহরাঞ্চলের দরিদ্র ও বেকার জনগণের জীবিকা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্ব-নির্ভরতা অর্জনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে। এটি মূলতঃ জাতীয় নগর জীবিকা মিশনের অধীনস্থ একটি রাজ্যন্তরীয় বাস্তবায়নকারী সংস্থা। জিরানীয়া মহকুমার অন্তর্গত রাণীরবাজার পুর পরিষদ ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশনের অধীনে এক মহৎ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মা বোনেদের স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে।

শহরের দরিদ্র জনগণের আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা, স্ব-সহায়ক গোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বনিযুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা। ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশনের উদ্দেশ্যই হল বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য বিভিন্ন কর্মমুখী ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা আত্মনিযুক্তি বা কর্ম সংস্থান করতে সক্ষম হতে পারে। কিংবা ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণ ও ভর্তুকির সুযোগ নিতে পারে। ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশন শহরের গরিব ও পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে স্বনির্ভরতা, দক্ষতা এবং আত্মমর্যাদা অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে যা রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি আর্থ-সামাজিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

শহরাঞ্চলের অনেক নারীই রয়েছেন যারা আর্থিক, সামাজিক কিংবা শিক্ষাগত কারণে মূলস্রোতের বাইরে পড়ে রয়েছেন, কিন্তু এই পিছিয়ে পড়া নয়, বরং তাদের হাত ধরেই সমাজ এগিয়ে যেতে পারে এই বিশ্বাস নিয়েই রাণীরবাজার পুর পরিষদ কাজ করে চলেছে দৃঢ় প্রত্যয়ে। ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশনের মাধ্যমে এখানকার নারীদের জন্য গঠিত হচ্ছে স্ব-সহায়ক গোষ্ঠী। যাদের মাঝে জাগ্রত হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। তৈরি হচ্ছে সঞ্চয়ের অভ্যাস এবং শেখানো হচ্ছে কীভাবে ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা যায়।

বর্তমানে রাণীরবাজার পুর পরিষদ এলাকায় গঠিত হয়েছে ১৮২টি স্ব-সহায়ক দল এবং গর্বের বিষয় হল-এই সমস্ত দলগুলি বর্তমানে সক্রিয়ভাবে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি গোষ্ঠী বা দল যেন এক একটি ছোট ছোট পরিবার। যেখানে সদস্যরা শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের পথেই হাঁটছেন না, বরং নিজেদের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব ও সামাজিক মর্যাদাকেও প্রতিনিয়ত নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিচ্ছেন। এই স্ব-সহায়ক দলগুলির মাধ্যমে গৃহিনী থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধাসহ বহু নারী নিজেদের জীবনের হাল ধরেছেন।

রাণীরবাজার পুর পরিষদ এবং ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশনের যৌথ উদ্যোগে এই গোষ্ঠীগুলিকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করা হয়। ব্যাঙ্ক লিয়েজ, ঋণ সহায়তা, পণ্যের বাজারজাত করণ এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধাগুলিও এই গোষ্ঠীগুলির কাছে সহজলভ্য করা হয়েছে। এই ১৮২টি স্ব-সহায়ক গোষ্ঠী আজ শুধু গোষ্ঠী নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক।

আরবান লাইভলিহুড মিশনের অন্তর্গত রাণীরবাজার পুর পরিষদ এলাকায় আত্মনির্ভরতার পথে এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। এখানকার ১৮২টি সক্রিয় দলের মধ্যে ১৭৪টি স্ব-সহায়ক দল দল প্রতি ১০ হাজার টাকা করে ইতিমধ্যেই রিভলভিং ফান্ড হিসেবে ১৭ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা পেয়েছে। এই আর্থিক সহায়তা শুধুমাত্র প্রাথমিক পুঁজির জোগান নয় বরং এক একটি স্বপ্নের ভিত্তিপ্রস্তর। এসব দলের অর্থনৈতিক ভিতকে আরও সুদৃঢ় করতে এখন পর্যন্ত তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার ঋণ।

এই ঋণ তাদের আত্মবিশ্বাসকে যেমন দৃঢ় করেছে তেমনি তাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলিকেও আরও মজবুত করে তুলেছে। এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যদি সঠিক সময়ে সঠিক সহায়তা মেলে তবে শহরের প্রান্তিক মা-বোনেরাও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজ ও পরিবারে অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারেন। রাণীরবাজার পুর পরিষদ এলাকার উন্নয়নে আত্মনির্ভরতার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে এখানকার স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির কর্মকান্ড।

ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এখন পর্যন্ত ১,৭৬০ জন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য ও সদস্যাকে বিভিন্ন জীবনোপযোগী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের তালিকা নেহাতই ছোট নয়, টেইলারিং থেকে শুরু করে ফুড প্রসেসিং, কৃত্রিম গয়না নির্মাণ, বেকারি আইটেম তৈরির কলাকৌশল, মোমবাতি ও আগরবাতি তৈরী, বুক কিপিং, জুট ব্যাগ প্রস্তুতকরণ, সাবান ও সফট টয় মেকিং এর মতো নানা ক্ষেত্রে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সেই সঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বাঁশশিল্প বা ব্যাম্বো ক্র্যাফটের মতো পরিবেশ বান্ধব হস্তশিল্পের উপরও। এই প্রশিক্ষণ শুধু দক্ষতা অর্জনের জন্য নয়, বরং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার এক সুনির্দিষ্ট পথ। প্রতিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এই নারীরা এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শুরু করেছেন, নিজের পরিবার ও সমাজ উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। এযেন নারী শক্তির জাগরণ, স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার এক নীরব ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

রাণীরবাজার পুর পরিষদ এলাকার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর এখন শুধু আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছেন তা নয়, তারা নিজেদের হাতে তৈরি পণ্যের মাধ্যমে স্বপ্নের দিগন্তও ছুঁতে শুরু করেছেন। তাদের সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতা আজ ধীরে ধীরে সাফল্যের পথে পা বাড়িয়েছে। প্রতিদিন তারা নিজ হাতে তৈরি জুট ব্যাগ, মোমবাতি, আগরবাতি, খাবারজাত দ্রব্য, কৃত্রিম গহনা, কিংবা বাঁশজাত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন।

এর মধ্যদিয়ে তারা নিজেদের রোজগার শুরু করেছেন এবং পরিবারে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই স্ব-সহায়ক দলের মধ্যে শ্যামপ্রসাদ সহায়ক দল সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি জাতীযন্তরের মেলায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে। মেলায় সেই বিশাল মঞ্চে তারা নিজস্ব হাতে তৈরী বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শণ করেছে ও বিক্রয় করেছে। মেলার দর্শক ও ক্রেতাগণ তাদের সৃজনশীলতা এবং নান্দনিক কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করে এসেছে এই স্ব-সহায়ক দল।

যা আজ অন্যদের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এযেন শুধু পণ্য বিক্রয় নয়, আত্মবিশ্বাসের জয়গান, আর্থিক স্বাধীনতার পথে নারীর দৃপ্ত পদচারণা। রাণীরবাজার পুর পরিষদের এই প্রচেষ্টা শুধু আর্থিক স্বাবলম্বন নয় বরং নারীদের আত্মপরিচয়ের সন্ধান এনে দিয়েছে। তারা আজ পরিবারের বোঝা নয়, বরং প্রাত্যহিক সাংসারিক জীবনের ফাঁকে ফাঁকে এই স্ব-সহায়ক দলগুলিতে কাজ করে তারা আজ সংসারে রুটি রুজির নিশ্চয়তা।