বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা সাহস ও সামাজিক জাগরন

। । অনুপম পাল ।।
শৈশব মানে হোসেখেলে বড় হওয়া, বইয়ের পাতা উলটে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা। সেই শৈশবটুকুও বিলীন হয়ে যায় এক রাতে-যখন পরিবারের ইচ্ছায়, নিজের স্বপ্নের বিপরীতে, বসতে হয় বিয়ের পিড়িতে। দীপা (ছদ্দনাম), বয়স মাত্র ১৫। দক্ষিণ ত্রিপুরার শান্তিরবাজার মহকুমার এক প্রত্যন্ত গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী সে। চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন, লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। একদিন পরিবারকে দারিদ্রতা থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু দীপার এই স্বপ্নগুলোকে হঠাৎই গলা টিপে হত্যা করল এক নিষ্ঠরু বাস্তবতা বাল্যবিবাহ।

দিনমজুর বাবা-মা, ঠাকুরদা-ঠাকুরমা ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া ছোট বোনকে নিয়ে দীপার পরিবার। সংসার অভাব অনটন লেগেই আছে। দারিদ্র আর সামাজিক চাপের অজুহাতে দীপার পরিবারের লোকেরা চুপিচুপি তার বিয়ে দিয়ে দেয় ২৯ বছরের এক যুবকের সঙ্গে। যুবকটি স্থানীয় হলেও বর্তমানে কর্মসূত্রে উড়িষ্যায় থাকে। বিয়ে ঠিক করার আগে দীপার মতামত নেওয়া হয়নি, হয়নি কোনও আইনি প্রক্রিয়া। তার অপ্রাপ্ত বয়সকে উপেক্ষা করে তাকে বিয়ের পিড়িতে বসানো হয়।

দীপার ইচ্ছা ছিল আরও পড়ার, আরও শিখে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু পরিবারের কাছে সে যেন হয়ে উঠে এক বোঝা। দীপার জীবন থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় তার শৈশব, তার স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের যুগে কি কিছুই আর একেবারে গোপন থাকে? সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে দীপার বিয়ের কথা। খবর পায় চাইল্ডলাইন। তারা সঙ্গে সঙ্গে মহকুমা শাসকের কাছে বিষয়টি জানায়। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে প্রয়াস নেয়।

কিন্তু পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশীরা এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। পরবর্তী সময় পুলিশি জেরায় ছেলের মা ও মেয়ের মা সত্যতা স্বীকার করে এবং দীপাকে স্বশরীরে থানায় হাজির করা হয়। তদন্তেক্রমে উঠে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য। এর আগেও নাকি দীপার পরিবার তাকে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।

ফলে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়-এটা আদৌ কি বিয়ে ছিল, না কি বহিরাজ্যে পাচারের চেষ্টা? প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করার জন্য চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তিনি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন এবং ইতিমধ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও রুজু হয়েছে।

চাইন্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী, ১৮ বছরের আগে কোনও মেয়ের বিয়ে দেওয়া অপরাধ। এই আইনের আওতায় প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলেও দীপার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আইন থাকা সত্বো পরিবারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে গোপনে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে। এর মূলে রয়েছে অসচেতনতা, কুসংস্কার, দারিদ্র্যতা ও পশ্চাৎপদ মানসিকতা।

আজও বহু মা বাবা মনে করেন, কন্যাসন্তান হচ্ছে তাঁদের বোঝা, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিয়ে দায় শেষ করতে পারলেই ভালো। তারা বোঝেন না, একটি মেয়ের স্বপ্ন নষ্ট করা মানে শুধু তার ভবিষ্যৎ নয়, সমাজের ভবিষ্যৎও নষ্ট করা। ছেলের পরিবারও এ বিষয়ে সচেতন নয়, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবেই বুঝে থাকে। দীপা আজও সেই সমাজের প্রতিনিধি, যেখানে মেয়েরা নিজের পরিবারের চাপে নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

বর্তমানে নারীরা তাঁদের কাজের নিরিখে সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং সুনামের সাথে কাজ করে চলেছেন। তারা প্রমান করেছেন মেয়েরাও ছেলেদের থেকে কোনো অংশ কম নয়। বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে মহকুমা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং কমিউনিটি ভিত্তিক এর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও বিষয়টির প্রতি যাতে সচেতন থাকে সে বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।

কিন্তু প্রশাসনের ধারাবাহিক প্রয়াস জারি থাকা সত্বেও এই ধরনের চেষ্টার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে এ লড়াই জেতা যে বড়ই কঠিন। প্রতিটি পরিবারকে বুঝতে হবে কন্যাসন্তান কোন বোঝা নয়, বরং সম্ভাবনার প্রতীক। শিক্ষার আলো পৌঁছাতে হবে প্রত্যেক ঘরে, বিশেষ করে মেয়েদের কাছে। শুধু প্রশাসন বা আইন দিয়ে এই প্রথা বন্ধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ, সচেতনতা ও সাহস।

মেয়ের বয়স না হলে তার বিয়ে নয় এটা শুধু একটি স্লোগান নয়, এটা প্রতিটি মেয়ের অধিকার। অভিভাবকদের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব, যেন আর কোনও দীপার স্বপ্ন এভাবে ভেঙে না যায়। দীপা আজ একা নয়, দীপা হলো সেই প্রতীক যে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে সমাজের ব্যর্থতা। দীপার গল্প যেন এখানেই থেমে না যায়। দীপার গল্প যেন আমাদের জাগিয়ে তোলে, সাহস দেয়-আরও অনেক মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর, তাদের স্বপ্নকে সুরক্ষা দেওয়ার। তাই সময় এসেছে সকলকে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার।