২৪তম সংগ্রমা পুজা ও মেলার উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী, জাতি ও জনজাতিদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য

অনলাইন ডেস্ক, ২৩ আগস্ট, ২০২৫: জনজাতিদের উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। জনজাতিদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তাদের ধর্মীয় আচার-আচরণ, পূজা-পার্বণকে সরকার সম্মান দিচ্ছে বেশি। গতকাল শান্তিরবাজার মহকুমার বীরচন্দ্র মনুতে সংগ্রমা মন্দির প্রাঙ্গনে ২৪ তম সংগ্রমা পূজা ও মেলার উদ্বোধন করে উদ্বোধকের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা একথাগুলি বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জনজাতি কল্যাণ মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা, এমডিসি সঞ্জিব রিয়াং, এডিসি’র কার্যনির্বাহী সদস্য ডলি রিয়াং, বিশিষ্ট সমাজসেবী বিপিন দেববর্মা, বিশিষ্ট ধর্মগুরু খবা রিয়াং এবং বিদ্যাজয় রিয়াং। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন ব্লু সংগ্রমা কমিটির সাধারণ সম্পাদক খনরাম রিয়াং।

উদ্বোধকের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহা আরও বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সবকা সাধ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাসের দিশায় বর্তমানে রাজ্য এক ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা গঠনের লক্ষ্যে উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। সবার মুখে হাসি ফোটানো এবং জাতি ও জনজাতিদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। রাজ্যের ১৯টি জনজাতি গোষ্ঠির সার্বিক উন্নয়নে সরকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ভারত টিকে আছে সনাতন ধর্মের ঐতিহ্যের উপর। বিবিধের মাঝে একতা ভারতের সনাতনী ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে সকলে মিলে রক্ষা করতে হবে। সনাতনী ঐতিহ্য মেনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতকে উন্নয়নের এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন যে যা আগামীদিনে গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনজাতি মনিষীদের সম্মান জানানোর জন্য ভগবান বীরসা মুন্ডাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জনজাতি গৌরব দিবস পালন করা হচ্ছে।

দৌপদী মুর্মুকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করা হয়েছে। আমাদের রাজোর জনজাতি সন্তান যীষ্ণু দেববর্মাকে রাজ্যপাল করা হয়েছে। পর পর ৭ বার জনজাতি সম্প্রদায়ের বিদ্দজনদের পদ্মশ্রী পুরষ্কার প্রদান করা হয়েছে। ব্লু বা রিয়াং জনজাতি সম্প্রদায়ের কুলদেবী সংগ্রমাকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকার বিশেষ নজর দিয়েছে। শুধু তাই নয় ব্লু-শরনার্থীদের খুব দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে এই সরকার। অন্ত্যোদয় যোজনা সহ বিভিন্ন যোজনার মাধ্যমে তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জনজাতিদের শিক্ষা সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভুতির প্রতি সম্মান জানিয়ে মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের জন্মদিনে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

আগরতলা বিমান বন্দরের নামাকরণ করা হয়েছে মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর। বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে মহারাজের মূর্তি। ২১টি একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল তৈরি করা হবে। রাজ্যের ৩টি ডিগ্রি কলেজে ছাত্রীদের জন্য ছাত্রী ছাত্রী নিবাস তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত ১২টি ব্লককে এসপিরেশন ব্লক এবং ধলাই জেলাকে এসপিরেশন জেলা হিসাবে ঘোষণা করে উন্নয়নমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই ব্লকগুলি এবং জেলার উন্নয়নের জন্য ১০% টাকা অতিরিক্ত মঞ্জুর করা হয়েছে। এসব এলাকায় জনজাতিদের জীবন জীবিকা, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংক থেকে ১৪০০ কোটি টাকা নিয়ে রাজ্য সরকার জনজাতিদের জন্য আরও বহু উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বড়মুড়া পাহাড়ের নাম হাতায়কতর, আঠরমুড়া পাহাড়ের নাম হাচুক বেরেম আর গন্ডাছড়ার নাম গন্ডা তুইসা নামাকরণ করা হয়েছে জনজাতিদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে। জনজাতিদের অন্যতম পোষাক রিযাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। রিষার মাধ্যমে এখন ত্রিপুরাকে সবাই চেনে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ নজর দিয়েছেন। তিনি এই অঞ্চলে শান্তিফেরানোর কাজ করেছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার হিরা মডেল ঘোষণা দিয়ে উন্নয়নকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। রেল যোগাযোগ উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। শক্তিশালী ইন্টারনেট গেট ওয়ে স্থাপন করা হয়েছে ত্রিপুরায়। ত্রিপুরায় ৬টা জাতীয় সড়ক করা হয়েছে আরও ৪টা জাতীয় সড়ক নির্মাণের জন্য সরকার প্রয়াস গ্রহণ করছে। এর ফলে জনজাতিদের আয় বাড়বে, পর্যটনের ক্ষেত্রে সম্পসারিত হবে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জেলায় জেলায় যাতে জনজাতিরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারে তার জন্য বনধন প্রকল্পে প্রায় ৮-৫টি বনধন বিকাশ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে আর্থিক দিক দিয়ে জনজাতিরা লাভবান হচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশন প্রকল্পে আগে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে রাবার চাষ হতো। এখন তা বাড়িয়ে ৬৯ হাজার হেক্টর জমিতে রাবার চাষের আওতায় আনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জনজাতি বিকাশ যোজনায় এখন অব্দি ১ হাজার ৩২৬ জন জনজাতি সুবিধাভোগীকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে। এতে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

জনজাতিদের উন্নয়নে বনদপ্তর থেকে নানা প্রকল্পের মাধ্যমে ১৭০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। বিভিন্ন জনজাতি সমাজপতিদের ২ হাজার টাকা সম্মানিক দেওয়া হচ্ছে। তা এখন বৃদ্ধি করে ৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এডিসি এলাকার উন্নয়নে বাজেটের বাইরে ১৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০২৪-২০২৫ অর্থবর্ষে। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। ব্রু ভাষায় রচিত গীতা এবং দেবী সংগ্রামার মুর্তি মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় জনজাতি কল্যাণ বিকাশ দেববর্মা বলেন খুব কম সময়ের মধ্যে জনজাতিদের সংস্কৃতি ও শিক্ষার বিকাশ সবচেয়ে বেশি উন্নতি ঘটিয়েছে বর্তমান রাজ্য সরকার। এ সরকার নাস্তিক নয় ধর্ম ও উন্নয়নে বিশ্বাসী করে। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এমডিসি সঞ্জিত রিয়াং এবং এডিসি’র কার্যনির্বাহী সদস্য ডলি রিয়াং। সংগ্রমা পূজা ও মেলা উপলক্ষে ২ দিন ব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।