অনলাইন ডেস্ক, ১১ জুলাই, ২০২৬: আগরতলার টিআইএফটি’র ওয়াররুমে আজ মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহার সভাপতিত্বে বর্ষাকালীন দুর্যোগ মোকাবিলা, রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং আগরতলা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাজ্যের সার্বিক দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থার প্রস্তুতি, বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতিতে করণীয় এবং আগরতলা শহরকে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতামুক্ত করার লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভার শুরুতে নগরউন্নয়ন দপ্তরের সচিব মিলিন্দ রামটেকে আগরতলা শহরের বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি, বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, নিকাশি ব্যবস্থা, নদী-খাল, পাম্পিং স্টেশন, চলমান ও প্রস্তাবিত উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং বর্ষাকালীন দুর্যোগ মোকাবিলায় গৃহীত প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। এরপর বিভিন্ন দপতরের সচিব ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকগণ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রস্তুতি, গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রীকে অবহিত করেন। বৈঠকে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকগণ ভার্চুয়াল মাধ্যমে অংশ নিয়ে জেলার প্রস্তুতি ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
সভায় আগরতলা পুর নিগমের মেয়র দীপক মজুমদার শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। পর্যালোচনা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বর্ষাকালে যেসব এলাকা বারবার জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি প্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে পরিকল্পিত উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, দুর্যোগ দেখা দেওয়ার পর তা মোকাবিলা করার চেয়ে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর, ফলপ্রসূ এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী। ২০২৪ সালে ত্রিপুরার ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বর্ষা শুরুর আগেই প্রতিটি দপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।
গতবার সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজ্য সফলভাবে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার আরও পরিকল্পিত, সমন্বিত ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষকে সম্ভাব্য দুর্যোগ সম্পর্কে আগাম সতর্ক করতে এবং প্রচারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। উদ্ধারকার্যে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্র সর্বদা প্রস্তুত ও ব্যবহারের উপযোগী রাখতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যবিধি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি, জরুরি সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের মজুত রয়েছে কিনা, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেন তিনি। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী আরক্ষা আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের ফেলে আসা বাড়িঘর ও সম্পত্তির নিরাপত্তাও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। অসাধু চক্র যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য নিয়মিত টহলদারি, নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। এক্ষেত্রে শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী গবাদিপ্রাণীর নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং খাদ্যের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ড্রেন ও নিকাশি ব্যবস্থার নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, নদী ও নদীবাঁধের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চব্বিশ ঘণ্টা সচল রাখা এবং হ্যালোজেন ট্যাবলেট, ব্লিচিং পাউডার, প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক, সাপের বিষের প্রতিষেধকসহ জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। আগরতলা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শহরের নদী, খাল, পুকুর, ড্রেনেজ ও নিকাশি ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন, সংস্কার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করে একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় মুখ্য সচিব জে. কে. সিনহা বলেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সকল দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করতে হবে। তিনি স্যাটেলাইট ফোন সর্বদা সচল রাখা, নদীবাঁধের ওপর নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকে নিয়মিত প্রশিক্ষিত রাখা এবং প্রতিটি দপ্তরকে সর্বক্ষণ প্রস্তুত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
সভায় এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর সচিব ড. পি. কে. চক্রবর্তী, স্বাস্থ্য ও পূর্ত দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে, বিদ্যুৎ দপ্তরের সচিব অভিষেক সিং, অর্থ দপ্তরের সচিব পি. কে. গোয়েল, আগরতলা পুরনিগমের কমিশনার সাজু বাহিদ এ, অতিরিক্ত ডিজিপি জি এস রাও, মুখ্যমন্ত্রীর অতিরিক্ত সচিব সমিত রায় চৌধুরী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের আধিকারিকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সচিব ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকগণ।









