অনলাইন ডেস্ক, ২৮ জুলাই, ২০২৬: আমাদের রাজ্যকে আর্থিকভাবে আরও সমৃদ্ধ, বিনিয়োগ বান্ধব, দক্ষ মানব সম্পদ সমৃদ্ধ এবং স্বনির্ভর রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলতে রাজ্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা রূপায়ন করছে। আর্থিক জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ মানবসম্পদই আগামী দিনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। আজ আগরতলার প্রজ্ঞাভবনে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই)-এর সঙ্গে সিপার্ড, শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর এবং দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তরের মধ্যে তিনটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের মাধ্যমে ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিকাশের পথে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। ভারতের অন্যতম শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব রাজ্যে আর্থিক সাক্ষরতা, বিনিয়োগের বিষয়ে সচেতনতা এবং পুঁজি ও বাজারভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে ত্রিপুরার অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে। মাত্র ছয় বছরের মধ্যে রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে এবং মাথাপিছু গড় আয় জাতীয় গড়ের সমপর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই অগ্রগতিকে আরও গতিশীল করতে রাজ্য সরকার উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ প্রসারে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে যুবসমাজ, উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক বাজার ও বিনিয়োগ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। ডিজিটাল রূপান্তর ও আর্থিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করতে এ ধরনের উদ্যোগ সময়োপযোগী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা, ডিজিটাল পেমেন্ট সহ বিভিন্ন উদ্যোগ দেশের যুবসমাজের সামনে আর্থিক পরিষেবা খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বর্তমানে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে ১৩ কোটিরও বেশি বিনিয়োগকারী যুক্ত রয়েছেন এবং এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেয়ারবাজার আজ আর কেবল বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই এর বিস্তার ঘটেছে। ত্রিপুরাতেও শেয়ারবাজার সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে নিরাপদ ও সচেতনভাবে এই খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন আর্থিক প্রতারণা, বিগত দিনে চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে ত্রিপুরার বহু মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকিং, আর্থিক পরিষেবা ও বীমা ক্ষেত্র বর্তমানে দেশের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ এবং দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তর যৌথভাবে শেয়ারবাজার, মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা এবং বিনিয়োগ পরামর্শ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করবে। এর ফলে রাজ্যের ছাত্রছাত্রী ও যুবসমাজের সামনে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান মানুষের আয় সৃষ্টি করে, আর আর্থিক দক্ষতা সেই আয়কে সম্পদে রূপান্তরিত করার পথ দেখায়। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সিপার্ড-র মাধ্যমে প্রশিক্ষিত মাস্টার ট্রেনারদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে, যাতে রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকাতেও বিনিয়োগের বিষয়ে শিক্ষা ও আর্থিক সচেতনতা পৌঁছে দেওয়া যায়। একইসঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের সঙ্গে এনএসই-এর এই অংশীদারিত্ব ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প, স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের নতুন সুযোগ এনে দেবে। এর ফলে রাজ্যে শিল্পায়ন, উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগ আরও গতি পাবে।
তিনি বলেন, ‘ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ-২০২৬’-এর সাফল্যের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই রাজ্যের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকের এই উদ্যোগ সেই বিনিয়োগের আগ্রহকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরার বর্তমান সরকার গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত পেপারলেস কর্মসূচি নিয়ে এসেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের এই অংশীদারিত্ব ত্রিপুরার মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা, নতুন কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচন করবে। অনুষ্ঠানে মুখ্য সচিব জে. কে. সিনহা বলেন, আজকের এই উদ্যোগ ত্রিপুরার উন্নয়ন ও অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। বর্তমানে রাজ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে জাতীয় স্তরে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ-২০২৬’-এ ৪৬৬টি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা রাজ্যের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
তিনি আরও বলেন, ত্রিপুরা আজ দেশের উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলেছে। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে যুবসমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের এই উদ্যোগ আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারী সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের চিফ রেগুলেটরি অফিসার অঙ্কিত শর্মা বলেন, আজকের এই অংশীদারিত্ব ত্রিপুরার নাগরিকদের আর্থিকভাবে আরও সক্ষম ও স্বনির্ভর করে তোলার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি বলেন, বর্তমানে ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশের এই বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ত্রিপুরাও ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। আর্থিক শিক্ষা, পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো উদ্যোগ আগামী দিনে রাজ্যের যুবসমাজ, উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে তিনটি পৃথক সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়। প্রথম সমঝোতাপত্রটি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সিপার্ড-র মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়, যার লক্ষ্য বিনিয়োগকারী সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা এবং সিপার্ড -কে একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্মার্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। দ্বিতীয়, সমঝোতাপত্রটি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ এবং শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের আর্থিক বাজার এবং পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। তৃতীয় সমঝোতাপত্রটি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ এবং দক্ষতা উন্নয়ন দপ্তরের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় রাজ্যের ছাত্রছাত্রী ও যুবসমাজের জন্য পুঁজিবাজার, মিউচুয়াল ফান্ড, আর্থিক পরিষেবা এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের মন্ত্রী সান্ত্বনা চাকমা, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব তথা শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্তে, ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কৃষ্ণন আইয়ার প্রমুখ ।









