আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ (এজিএমসি) ও জিবিপি হাসপাতালকে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম উৎকর্ষ চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং সুপার স্পেশালিটি স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রে পরিণত করতে রাজ্য সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ত্রিপুরাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। আজ আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ (এজিএমসি) ও জিবিপি হাসপাতালের ২২তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কেএলএস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উদ্বোধক তথা প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এক সময় ত্রিপুরায় সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিই ছিল অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। কিন্তু আজ এজিএমসি শুধু চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রেই নয়, চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং সুপার স্পেশালিটি পরিষেবার ক্ষেত্রেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান শুধু রোগ নিরাময়ের কেন্দ্র নয়, এটি মানবসেবা, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজ্যের চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এক সময় রাজ্যে এমবিবিএস আসনের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত।
বর্তমানে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিতে এমবিবিএসের মোট আসন সংখ্যা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজে ধাপে ধাপে আসন বৃদ্ধি, ডেন্টাল কলেজের আসন বৃদ্ধি, স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং নতুন বিশেষায়িত কোর্স চালুর ফলে রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের জন্য চিকিৎসা শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তিনি জানান, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যে সরকারি ডেন্টাল কলেজ চালু করা হয়েছে এবং এর পরিকাঠামো আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাজ্যে একটি স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় কার্যকর হলে চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। কিছুদিন আগে আগরতলা জ্যাকসন গেট এলাকায় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আগরতলা সিভিল হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। এই হাসপাতালে ইন্টিগ্রেটেড হসপিটাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রোগী নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এই হাসপাতালে সান্ধ্যকালীন ওপিডিও চালু করা হয়েছে।
রাজ্যের চিকিৎসকদের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এক সময় ছোটখাটো জটিল রোগের ক্ষেত্রেও রোগীদের বহিঃরাজ্যে রেফার করতে হতো। কিন্তু আজ আমাদের চিকিৎসকদের দক্ষতা, নিষ্ঠা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে এজিএমসি ও জিবিপি হাসপাতালে অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারও সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এই সাফল্যের ফলেই বহিঃরাজ্যে রোগী রেফার করার হার বিরাট শতাংশ কমেছে।
তিনি আরও বলেন , রাজ্যে ইতোমধ্যেই ৯টি সফল কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী দিনে লিভার ও হার্ট প্রতিস্থাপন পরিষেবা চালুর লক্ষ্যে সরকার পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলেছে। এরফলে রাজ্যের মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আর বাইরে যেতে হবে না; নিজ রাজ্যেই আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্য পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করছে। শুধু আগরতলা নয়, বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে ট্রমা কেয়ার সেন্টার, কার্ডিয়াক কেয়ার সেন্টার এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট গড়ে তোলা হচ্ছে। জেলা সহ মহকুমা হাসপাতালগুলিকেও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।চিকিৎসা ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিমেডিসিন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, চিকিৎসা পেশা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানবসেবার এক মহান অঙ্গীকার। রোগীর প্রতি সহমর্মিতা, সততা, নিষ্ঠা এবং পেশাগত দক্ষতাই একজন চিকিৎসকের প্রকৃত পরিচয়। এতে চিকিৎসকের প্রতিও রোগীর গ্রহণ যোগ্যতা বাড়ে।চিকিৎসকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা বিবেচনা করে এজিএমসি ক্যাম্পাসে খেলার মাঠ, ইনডোর স্পোর্টস কমপ্লেক্স, ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যায়ন এবং জিমনেসিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা, মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা , আয়ুষ্মান ভারত এবং মুখ্যমন্ত্রী নিরাময় আরোগ্য অভিযানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ – ২৭ অর্থবছরের এপ্রিল-মে মাসে সম্পূর্ণ টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৮১.৭% শতাংশ শিশুকে টিকা প্রদান করা হয়েছে, যা আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
মুখ্যমন্ত্রী সুস্থ শৈশব ও সুস্থ কৈশোর অভিযানের মাধ্যমে ১ থেকে ১৯ বছর বয়সী ১০ লক্ষেরও বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীর কাছে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য পরিসেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।জিবিপি হাসপাতালে রোগীর পরিজনদের জন্য মাত্র ১০ টাকায় দুপুরের আহারের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বৃহত্তর পরিসরে ‘ভারত মাতা ক্যান্টিন’ এবং আধুনিক নাইট শেল্টার নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।
অনুষ্ঠানে আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ (এজিএমসি) এবং বিবেকনগরস্থিত রামকৃষ্ণ মিশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতার মাধ্যমে রামকৃষ্ণ মিশনের ‘নিরাময়’ মেডিক্যাল সার্ভিস ইউনিটকে এজিএমসি ও জিবিপি হাসপাতালের অধীনে অতিরিক্ত আরবান হেলথ ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এর ফলে কমিউনিটি-ভিত্তিক চিকিৎসা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্য পরিষেবা আরও শক্তিশালী হবে। এ উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী রামকৃষ্ণ মিশনের দীর্ঘদিনের মানবকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যসেবা, সমাজসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, মানবসেবায় রামকৃষ্ণ মিশনের অবদান সমগ্র দেশের কাছেই অনুকরণীয়। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব রাজ্যের চিকিৎসা শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। তিনি আজকের অনুষ্ঠানের সফলতা কামনা করেন, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং বিকশিত ত্রিপুরা গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে কৃতী চিকিৎসক শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষাগত সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ স্মারক ও শংসাপত্র প্রদান করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীসহ উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ তাঁদের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।
এদিন অল ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন-এর উদ্যোগে এক অসচ্ছল স্বাস্থ্যকর্মীকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৫০ হাজার টাকার চেক মুখ্যমন্ত্রীর হাত দিয়ে প্রদান করা হয়। পাশাপাশি আসামের বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় আসাম মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলের জন্য এক লক্ষ টাকার চেক সংগঠনের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠনের স্বাগত ভাষণ দেন এজিএমসি-র অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. তপন মজুমদার। তিনি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, এজিএমসি-র ২২তম প্রতিষ্ঠা দিবস চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার অগ্রযাত্রার এক গর্বের মুহূর্ত। এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে রক্তদান শিবির, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিসহ জিবিপি হাসপাতাল এবং রাজ্যের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জিবিপি হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. বিধান গোস্বামীও। ধণ্যবাদ জ্ঞাপন করেন জিবিপি হাসপাতালের ডেপুটি মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. কনক চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জিবি রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান তথা বিধায়ক মিনারানী সরকার, স্বাস্থ্য দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে, ত্রিপুরা জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের মিশন ডিরেক্টর সাজু বাহিদ এ, স্বাস্থ্য দপ্তরের অধিকর্তা ডা. দেবাশ্রী দেববর্মা, মেডিক্যাল এডুকেশনের ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. অভিজিৎ দত্ত, পরিবার কল্যাণ ও রোগ প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা পরিষেবার অধিকর্তা ডা. অঞ্জন দাস, বিবেকনগর রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পাদক স্বামী শুভকারানন্দ মহারাজ প্রমুখ।









